ধান উৎপাদনে বিশ্বে ভারত-চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে। তবে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনে বিশ্বে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। মরক্কো, ব্রাজিল, মিসর ও চীনে বাংলাদেশের চেয়ে হেক্টরপ্রতি দেড় গুণ ফলন হয়। অস্ট্রেলিয়ায় ফলন আড়াই গুণ ও তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দ্বিগুণ। এমনকি ভিয়েতনামে বাংলাদেশের চেয়ে হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় দেড় টন বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশ প্রথাগত কৃষিকে পেছনে ফেলে আধুনিক প্রযুক্তি (ড্রোন, স্মার্ট সেচ) ও উন্নত চাষাবাদ এবং উচ্চমূল্যের ফসলে মনোযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে টেকসই চাষাবাদ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সরঞ্জামের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করছে। যে কারণে সেখানে ফলন বাড়ছে। বিপরীতে বাংলাদেশকে জলবায়ুর অভিঘাতের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে; একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের মতো ড্রোন, স্মার্ট সেচ, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ফার্ম ম্যানেজমেন্ট ও উন্নত যান্ত্রিকীকরণও এখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ ব্যতীত ফলন বাড়ানো সম্ভব নয়।
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, হেক্টরপ্রতি ধানের ফলনে বিশ্বে শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ১০ দশমিক ৯২ টন। সেখানে বাংলাদেশের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ৪ দশমিক ৮২ টন। ওই অর্থবছরে বিশ্বে হেক্টরপ্রতি ধানের গড় ফলন ছিল ৪ দশমিক ৬৯ টন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে হেক্টরপ্রতি ফলন ৮ দশমিক ৪১ টন। তুরস্কে ৮ দশমিক ৯৩ টন, মিসরে ৮ দশমিক ৪৪, পেরুতে ৮ দশমিক ২১, মরক্কোয় ৭ দশমিক ৮৬, ব্রাজিল ৭ দশমিক ২৩ ও চীনে এ হার ৭ দশমিক ১৫ টন। জাপানে ৬ দশমিক ৮৭ টন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬ দশমিক ৮৫, ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ১৬ ও ইরানে ৫ দশমিক ৩২ টন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। ভারতে হেক্টরপ্রতি ধানের ফলন ৪ দশমিক ৩৮ ও পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৭৪ টন।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বে এখন আধুনিক তথা স্মার্ট কৃষির চর্চা চলছে। ড্রোনের মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, রোগ-পোকার আক্রমণ শনাক্ত, বালাইনাশক স্প্রে, খরা বা জলাবদ্ধতা শনাক্তের জন্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা, খরা, লবণাক্ততা ও রোগ সহনশীল জাত উদ্ভাবন, কম সময়ে বেশি ফলনের জন্য উন্নত বীজ ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া আবহাওয়া, বাজারদর, চাষ নির্দেশিকার জন্য বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ বা বার্তা অ্যাপস ব্যবহার বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। তবে এসব জায়গায় বাংলাদেশ এখনো অনেকটাই পিছিয়ে।
দেশে প্রতি বছরই বিপুল হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। এতে বাড়ছে খাদ্য চাহিদাও। বিপরীতে দেশে প্রতি বছর দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। একদিকে জমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ুর অভিঘাতেও উৎপাদন কমছে। ফলে এ খাতে বিগত বছরগুলোর তুলনায় গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধিও কমেছে। সার, বীজ, কীটনাশকের মতো উপাদানের জন্য আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। কৃষকের ব্যয় হচ্ছে বেশি। সেজন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এ খাতে সরকারি সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছেন।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চীন, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিটপ্রতি ধান-গম উৎপাদনে আমাদের চেয়ে এগিয়ে। আমরা অবশ্য ভারতের চেয়ে বেশি। আমরা প্রাযুক্তিকভাবে অনেক পিছিয়ে। আমাদের কৃষকের তেমন আপগ্রেড এখনো হয়নি। অন্যান্য দেশে যে পরিমাণের সরকারি সাপোর্ট কৃষকদের দেয়া হয় সেটাও আমাদের এখানের চেয়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি আমাদের কৃষকের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ কম। সেসব দেশে এসবের সুযোগ অনেক রয়েছে। এছাড়া তাদের প্রযুক্তিগুলো আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। এ কারণে তাদের চেয়ে ফলনে আমরা পিছিয়ে আছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব আছে। যেটির প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। তবে আমরা হয়তোবা অদূরভবিষ্যতে তাদের সমপর্যায়ে যেতে পারি। সেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অন্যথায় খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ভুগতে হবে।’
উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজের উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন উল্লেখ করে এ কৃষি অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘হাইব্রিড বীজের কিছু কিছু এখন আমাদের নিজেদের হচ্ছে। ব্রি উৎপাদন আবার কিছু কোম্পানিও করছে। তবে হাইব্রিডের বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। কাজেই সবকিছু মিলিয়ে আমাদের বীজেরও একটা সমস্যা আছে। উপকরণগুলোও বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করি। সার, কীটনাশক, সেচ ইকুইপমেন্ট, ট্রাক্টর, পাওয়ার ট্রিলার এসব উপকরণও আমদানি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং কৃষকের মুনাফা কমে আসছে। সেজন্য এখানে কৃষক ও সরকারের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’
বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক ধান উৎপাদনকারী দেশ হলেও প্রায় প্রতি বছরই চাল আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। স্ট্যাটিস্টার তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাল আমদানিতে বিশ্বে উনিশতম বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ আমদানিকারক ও এশিয়ায় আমদানিকারক দেশের তালিকায় নবম। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত অর্থবছরে ১৪ লাখ ৩৭ হাজার টন চাল আমদানি করেছে বাংলাদেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ লাখ ৪২ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে।
ফলনের জন্য আধুনিক চর্চার পাশাপাশি উন্নত বীজও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধানের বীজ উৎপাদনে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ বীজ আমদানি করতে হয়। আবার মোট চাষ করা জমির ২০ শতাংশে হাইব্রিড ধান চাষ করা হয়। তবে এ চাহিদার মাত্র ১ শতাংশের মতো বীজ সরকারিভাবে উৎপাদন হয়।
কৃষিবিদরা বলছেন, বীজ, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও জলবায়ুর কারণে উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি কৃষকদের জ্ঞানের ঘাটতি, আর্থিক সক্ষমতা, সচেতনতার মতো নানা কারণেও ফলন কম হয়। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার সঙ্গে সেজন্য মাঠে উৎপাদিত ফলনের বড় পার্থক্য থাকে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফলনের ক্ষেত্রে জাতের একটা প্রভাব আছে। এর সঙ্গে রয়েছে তার ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ। এ তিনটি মিলেই কিন্তু ফলন আসে। বোরো মৌসুমে আবহাওয়া রৌদ্রোজ্জ্বল থাকে। সেজন্য আমনের তুলনায় এ মৌসুমে ফলনও বেশি হয়। এর সঙ্গে আবহাওয়া খারাপ হলে ধানের জীবৎকালও কমে আসে। জীবৎকাল ও তাপমাত্রা উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। চীন হাইব্রিড বীজ চাষ করে। তাদের কাছ থেকেও হাইব্রিড আমদানি হয়। কিন্তু তাদের হাইব্রিড হচ্ছে টু লাইন হাইব্রিড (দুটি প্যারেন্ট লাইন)। আমাদেরগুলো থ্রি লাইন হাইব্রিড। ফলে সেখান থেকে হাইব্রিড আনলেও এখানে একই রকম ফলন পাচ্ছি না। কারণ আবহাওয়া একটা বড় বিষয়। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতিও আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা গবেষণা মাঠে যে ফলন পাই কৃষক সেই পরিমাণ ফলন পান না। জাতের সঙ্গে ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলনের ক্ষেত্রে জাতের অবদান ৪০ শতাংশ, ৬০ ভাগ অবদান ব্যবস্থাপনার। এর মধ্যে রয়েছে পানি ব্যবস্থাপনা, আগাছা ব্যবস্থাপনা, সুষম সার ও কীটনাশক ইত্যাদি বিষয়। আমাদের কৃষকরা আর্থিকভাবে সচ্ছল না। ফলে অনেকে সময়মতো এসব ব্যবস্থাপনা করতে পারেন না। এমনও হয় পোকায় ধান খেয়ে যাচ্ছে কৃষকের হাতে কীটনাশক কেনার টাকা নেই। তিনি ডিলারের কাছে ছুটছেন বাকি নিতে, পাননি। দুইদিন পর টাকা জোগাড় করে কীটনাশক ছিটিয়েছেন, কিন্তু তার আগে হয়তো অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সেজন্য ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের জ্ঞান ও শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে এটা স্বীকার করতে হবে। এর পরও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারছি কিন্তু এ কৃষকদের কারণেই। এ কৃতিত্ব তাদের দিতে হবে।’
সরকারিভাবে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন করে থাকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্বে থাকা সদস্য পরিচালক (সার ব্যবস্থাপনা) মো. ওসমান ভুইয়ার মন্তব্য জানতে ফোন করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মন্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চীন, তুরস্ক, ভিয়েতনাম বা অন্যান্য যেসব দেশে অধিক ফলন হয় তারা মূলত প্রযুক্তির কল্যাণে এগিয়ে গেছে। আমাদের চেয়ে ওদের কৃষি প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত। বীজ থেকে শুরু করে ক্যাপাসিটি অনেক কিছুই তাদের উন্নত, আর যেসব পদ্ধতি আছে সবই সর্বাধুনিক। তারা ড্রোন ব্যবহারও করছে। ফলে এ কারণে একটা পার্থক্যের ব্যাপার তো অটোমেটিক চলে আসে। সেখানে আমরা এখনো উন্নত কৃষিতে পৌঁছার সংগ্রামে লিপ্ত আছি। তার পরও আমাদের কাছে যতটুকু সামর্থ্য আছে তা দিয়েই কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজ করছি।’