সকালে ঘুম থেকে উঠেই পুকুরের তাজা মাছ পাচ্ছেন রাজধানীবাসী। নাটোরের পুকুর থেকে সরাসরি এ জীবন্ত মাছ ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারগুলোয়। কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম ছাড়া সারা বছরই এ জেলা থেকে জীবন্ত মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে। মাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে একসময় চাষীরা ফরমালিন ব্যবহার করলেও এখন লাইভ ফিশ বা জীবন্ত মাছ সে স্থান দখল করেছে। প্রতি বছর উত্তরের জেলা নাটোর থেকে অন্তত ২৭ হাজার টন জীবন্ত মাছ যাচ্ছে রাজধানীতে, যা টাকার অংকে ৫৪০ কোটিরও অধিক ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জীবন্ত মাছ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার কারণে মৎস্য সেক্টরে এক নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। আগামী দিনে এ খাতের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধান করা হলে সম্ভব হলে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান। এতে বেকার সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
নাটোর সদর উপজেলার সফল মৎস্যচাষী আব্দুল কাদের। দীর্ঘদিন মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত তিনি। একসময় মাছ পচে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে ফরমালিন ব্যবহার করতে হতো তাকে। তবে এখন আর মাছে ফরমালিন ব্যবহার করতে হয় না আব্দুল কাদেরকে। পুকুর থেকে সরাসরি তিনি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জীবন্ত মাছ পাঠিয়ে থাকেন। আর পুকুর পাড়ে বসে নিজেই সে কাজের তদারকি করেন। মাত্র ৫-৬ ঘণ্টার মধ্যেই লাইভ ফিশ বা জীবন্ত মাছ রাজধানীতে পাঠাতে পারছেন তিনি। এতে করে ভালো দামও পাচ্ছেন এ মৎস্যচাষী।
আব্দুল কাদেরের মতো অনেক চাষীই এখন জীবন্ত মাছ পাঠাচ্ছেন রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায়। নাটোর সদর, গুরুদাসপুর এবং সিংড়া উপজেলা থেকে সবচেয়ে বেশি জীবন্ত মাছ যাচ্ছে রাজধানীতে। এর মধ্যে সদর উপজেলার ছাচনী, লক্ষ্মীপুর ও কলাবাড়ীয়া এবং গুরুদাসপুর উপজেলার মহারাজপুর ও চাপিলা গ্রামে উৎপাদিত জীবন্ত কার্প জাতীয় মাছ সারা দেশে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন বিকাল থেকেই এসব গ্রামে মৎস্যচাষীদের বাড়ি থেকে ট্রাকে ছোট ছোট পানির ড্রামে করে এসব মাছ পাঠাতে দেখা যায়।
আরেক সফল মৎস্যচাষী অরুণ কুমার ঘোষ বলেন, আশির দশক থেকে নাটোরের মৎস্য খাতে পরির্বতন শুরু হয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখছে মৎস্য সেক্টর। জেলায় অন্তত ২৫ হাজার মানুষ মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত। তবে দফায় দফায় খাদ্যের দাম বাড়ায় মাছ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। এরপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এ দুই দেশের যুদ্ধের পর বড় ধাক্কা খেয়েছে মৎস্য সেক্টর। তবে এ সেক্টরকে উন্নত করা প্রয়োজন। না হলে মাছ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন মৎস্য চাষীরা।
নাটোর জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, দেশে মাছ উৎপাদনের দিক থেকে ২২তম জেলা নাটোর। লাইভ ফিশ বা জীবন্ত মাছ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার কারণে মৎস্য সেক্টরে নতুন সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে এ খাতের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধান সম্ভব হলে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি পরিবর্তন আসবে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্র আরো জানায়, জেলায় দিন দিন বেড়েই চলছে পুকুরের সংখ্যা। বাড়ছে মাছের উৎপাদনও। বর্তমানে নাটোর জেলায় পুকুরের সংখ্যা ২৮ হাজারের অধিক। আর প্রতি বছর এসব পুকুর থেকে কার্প জাতীয় মাছ উৎপাদন হচ্ছে অন্তত ৪৮ হাজার টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যার বেশির ভাগ যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এতে করে মাছের ভালো দাম পাচ্ছেন চাষীরা।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, কার্প জাতীয় মাছ ফ্যাটেনিংয়ের জন্য নাটোর জেলা একটি মডেল। এ জেলা থেকে প্রতিদিন ১৫০-২০০ ট্রাক তরতাজা মাছ নিয়ে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় বাজারে চলে যায়। প্রতিটি ট্রাকে অন্তত ৬০০-৭০০ কেজি মাছ থাকে। এতে আমরা হিসাব করে দেখেছি, বছরে ২৭ হাজার টন মাছ যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়। ফলে জীবন্ত মাছ সরবরাহের জন্য নাটোর জেলা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব মাছ রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় যাওয়ায় মৎস্যচাষীরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। এতে করে তারা মাছ চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। বর্তমানে ২৩০-২৬০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে মাছ বিক্রি হচ্ছে।