রাষ্ট্রীয় উদাসীনতায় হুমকির মুখে মাঠ-পার্ক-জলাধার: পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগ

শনিবার রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে 'ক্লাব কর্তৃক মাঠ পার্ক দখল বন্ধে সরকারের করণীয়: নাগরিকদের প্রত্যাশা' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাঠ, পার্ক ও জলাধার দখলমুক্ত আন্দোলনের ব্যানারে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশকর্মীরা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

রাজধানী ঢাকার খেলার মাঠ, পার্ক ও জলাধারগুলো প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, ক্লাব ও অপশক্তির আগ্রাসনে বিপর্যস্ত। এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। এর জন্য রাজনৈতিক দলসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা ও জবাবদিহিতাকে দায়ী করেছেন পরিবেশকর্মীরা।

শনিবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে 'ক্লাব কর্তৃক মাঠ পার্ক দখল বন্ধে সরকারের করণীয়: নাগরিকদের প্রত্যাশা' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাঠ, পার্ক ও জলাধার দখলমুক্ত আন্দোলনের ব্যানারে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশকর্মীরা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এ সময় বক্তারা বলেন, সারা দেশে নানাভাবে সরকারি খেলার মাঠ-পার্ক দখলের হিড়িক চলছে। উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা মহানগরীর মাঠ ও পার্কগুলো কিছু ক্লাবের দখলে চলে যাচ্ছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং পুলিশ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতার ফলে মাঠ ও পার্কগুলো বিভিন্ন ক্লাবের নামে দখল করে নিচ্ছে কিছু ব্যক্তি ও অপশক্তি। আদালত একাধিকবার দখল করা মাঠ ও পার্ক উদ্ধারের নির্দেশ দিলেও রাজউক ও সিটি করপোরেশন সেই নির্দেশনা অগ্রাহ্য করেছে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্কের মতো অনেক মাঠ ও পার্ককে অপারেটর নিয়োগের নামে ক্লাবের কাছে ইজারা বা হস্তান্তর করা হয়েছে উল্লেখ করে পরিবেশকর্মীরা বলেন, গুলশানে শহীদ তাজউদ্দিন স্মৃতি পার্ক ৮ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। এ মাঠ ও পার্কটি গুলশান ইয়ুথ ক্লাব ধ্বংস করে কিছু লোকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর করেছে। বৃষ্টির পানি নির্গমনের জন্য রাখা উন্মুক্ত স্থানটি তারা ঢালাই দিয়ে বন্ধ করে ফুটবলের টার্ফ বানিয়েছে। ঘণ্টা প্রতি সেই টার্ফ কয়েক হাজার টাকায় ভাড়াও দিচ্ছে। পার্কের ঘাসে ঢাকা সবুজ চত্ত্বর ধ্বংস করে নিজেদের দখলে নিয়েছে। মাঠ ও পার্কের সব প্রবেশ পথে নিরাপত্তা প্রহরী বসিয়ে জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এভাবে পার্ক ও মাঠ দখল করে ইচ্ছামত স্থাপনা তৈরিসহ বেআইনিভাবে এর প্রকৃতি ও শ্রেণী পরিবর্তন করে ভাড়া বা ইজারা প্রদানের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার সুস্পষ্টভাবে আইন পরিপন্থী।

এই পার্ক ও মাঠ নিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে ৩টি মামলা দায়ের এবং নিস্পত্তি হয়। সবগুলোতেই আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্ট বিভাগ রাজউককে দখল উচ্ছেদের এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে কোনোভাবে লিজ বা দখল দেয়া বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, কোনো অদৃশ্য কারণে রাজউক ও ডিএনসিসি আদালতের আদেশ লঙ্ঘন ও অবমাননা করে চলেছে।

বক্তারা বলেন, নিজস্ব পরিদর্শনে চুক্তির শর্তভঙ্গের প্রমাণ এবং আদালতের নির্দেশের পর নিজেরাই ইমারত ভেঙ্গে ফেলার ও ইয়ুথ ক্লাবের কাছ থেকে পার্কটি হস্তগত করার সিদ্ধান্ত নেয় রাজউক। পাশাপাশি ডিএনসিসির সঙ্গেও চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৩১ অক্টোবর রাজউকের সাধারণ সভায় এসব সিদ্ধান্ত চূড়ান্তও হয়। কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো ক্লাবের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুলাই ৮ম সভায় চুক্তিটি পুনর্বহাল করেছে ডিএনসিসি।

পরিবেশকর্মীদের মতে, মাঠ ও পার্ক সংক্রান্ত আইন এবং পরিবেশ আইন সংশোধন না করা হলে সরকারি সংস্থা ও ক্লাবগুলোর এই ধরনের বেআইনি কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

পল্লীমা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা হাফিজুর রহমান ময়নার সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন পবা'র সাধারণ সম্পাদক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পবার সম্পাদক আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ। আলোচনায় অংশ নেন জনস্বাস্থ্য ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন-এর সমন্বয়ক আমিরুল রাজিব, সৈয়দ ইসতিয়াক আহমেদ, সংগঠক, সেভ ধানমন্ডি প্লেগ্রাউন্ডস, তেঁতুলতলা মাঠ বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সৈয়দা রতনা, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ।

আরও