বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি সে প্রভাতফেরিতে

আজ অমর একুশে। না, একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কোনো গুরুগম্ভীর রচনা লিখতে বসিনি, স্মৃতিচারণও আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি শুধু কয়েকটা কথা বলতে চাই। উচ্চমার্গের কোনো বক্তব্য নয়, স্রেফ সাদামাটা কিছু কথা মাত্র।

আজ অমর একুশে। না, একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কোনো গুরুগম্ভীর রচনা লিখতে বসিনি, স্মৃতিচারণও আমার উদ্দেশ্য নয়, আমি শুধু কয়েকটা কথা বলতে চাই। উচ্চমার্গের কোনো বক্তব্য নয়, স্রেফ সাদামাটা কিছু কথা মাত্র।

কেউ বলেনি, কেউ নির্দেশ দেয়নি, কেউ সাজায়নি কিন্তু সেই প্রথম থেকেই একুশ উদযাপনের সবচেয়ে পবিত্রতম দিক ছিল প্রভাতফেরি—একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরের আলো ফুটলেই স্বতঃস্ফূর্ত নগ্ন পদযাত্রা মানুষের শহীদ মিনারের উদ্দেশে। কেউ একা একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কখনোবা যূথবদ্ধভাবে। ভোরের আলো ফুটছে, মানুষের শান্ত মিছিল চলছে ধীরপায়ে শহীদ মিনারের প্রতি, পুরুষদের পরিধানে পাজামা-পাঞ্জাবি, নারীদের সাদা শাড়ি, কালো পাড়। হাতে ফুলের মালা, পুষ্পস্তবক। শিশুরাও আছে মা-বাবার হাত ধরে, তাদের কচি হাতেও ফুল।

সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ সে অমর গান ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে-বাতাসে। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে আবেগে, সে গানের অনুরণন আমাদের প্রতি রোমকূপে—সে এক অনন্য অনুভূতি।

বড় মায়ায়, অনেক শ্রদ্ধায় আমরা হাতের ফুল নামিয়ে রাখছি মিনারের বেদিতে। না, ধাক্কাধাক্কি নেই, আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা নেই, ছবি তোলার উদ্দামতায় একুশকে অবমাননা করার কোনো প্রচেষ্টা নেই। শহীদ মিনার থেকে আজিমপুর গোরস্তান—শহীদদের সমাধিস্থলে। সেখানেও সারিবদ্ধ মানুষ ধীর নগ্ন পদযাত্রায়। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ছাপ প্রতিটি মানুষের মুখে একটি পবিত্র কাজ সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ায়। আজিমপুর থেকে গন্তব্যস্থল বাংলা একাডেমি।

আমাদের কৈশোরে-যৌবনে এটাই তো দেখেছি একুশে ফেব্রুয়ারিতে। বাহুল্য নেই, বাণিজ্যিকতা নেই, রাজনীতি নেই—আছে শুধু ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর মমতা, বাংলা ভাষার প্রতি অপার মায়া আর নিজের ভাষার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার।

একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাতফেরিতে যাওয়া আমাদের কাছে ছিল প্রার্থনার মতো। বড় পবিত্র সে নগ্ন পদযাত্রা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছি সে প্রভাতফেরিতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার ছাত্রজীবনে দেখেছি সে প্রভাতফেরিতে। একুশ শুরুই হতো প্রভাতফেরি দিয়ে। সে প্রভাতফেরির আমেজ পেতে চাইলে বর্তমান প্রজন্ম শহীদ জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটি দেখতে পারে।

আমি বহুকাল প্রভাতফেরিতে যাই না। আসলে বিশের মধ্যরাতে একুশ শুরু হলে তার আর কোনো প্রভাতফেরি থাকে না। আমরা ভুলে যাই, মধ্যরাতে দিনের শুরু পাশ্চাত্য কায়দায়, প্রাচ্যে দিনের শুরু সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। বাঙালির দিনের শুরু ঊষালগ্নে।

একুশ আমাদের মুক্তি দিয়েছিল—মুক্তি দিয়েছিল চাপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রভাষার শৃঙ্খল থেকে। কিন্তু সেই মুক্তিদাত্রী একুশকে আজ আমরা বন্দি করেছি বাণিজ্যিকতা, স্থূলতা, লৌকিকতা, আনুষ্ঠানিকতা ও আত্মপ্রচারে। আমরা নষ্ট করেছি তার স্বতঃস্ফূর্ততা, গাম্ভীর্য আর পবিত্রতা। এবারের একুশে আমার একটিই কেবল আকুল আবেদন, ‘একুশকে মুক্তি দিন সব আরোপিত কৃত্রিম শৃঙ্খল থেকে এবং আমার চিরায়ত প্রভাতফেরি আমাকে ফিরিয়ে দিন।’

 

ড. সেলিম জাহান: ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক

আরও