কুর্মিটোলা থেকে আব্দুল্লাহপুর

খানাখন্দে ভরা সার্ভিস লেন বাস থামছে মূল সড়কে, ঘণ্টা পার পাঁচ কিলোমিটার যেতেই

বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্তে পানি জমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় কোথাও কোথাও মাসের পর মাস পানি আটকে থাকে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। দীর্ঘদিন জমে থাকা স্থির পানিতে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কুর্মিটোলা থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের সার্ভিস লেনজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। কোথাও পিচ উঠে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও আবার কাদা-পানিতে একাকার সড়ক। ফলে সার্ভিস লেনে বাস চলাচল ও যাত্রী ওঠানামা ব্যাহত হওয়ায় গণপরিবহনকে থামতে হচ্ছে মূল মহাসড়কেই। এতে ব্যস্ত এ সড়কে যানবাহনের গতি কমে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। ফলে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই অনেক সময় লেগে যাচ্ছে ঘণ্টারও বেশি।

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার দূরপাল্লার ও আন্তঃজেলা বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম প্রধান এ করিডোরের সার্ভিস লেনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বেহাল থাকায় এখন এর প্রভাব পড়ছে মূল সড়কের যান চলাচলেও।

সরজমিনে দেখা গেছে, কুর্মিটোলা থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন স্থানে সার্ভিস লেনের পিচ ও ঢালাই উঠে গেছে। অন্তত ১৫টি পয়েন্টে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বিমানবন্দর পেরিয়ে জসীমউদ্‌দীন বাস স্টপ, আজমপুর, রাজলক্ষ্মী এবং বিভিন্ন ফুটওভার ব্রিজের নিচের সার্ভিস লেনের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। কোথাও ইটের খোয়া ও ভাঙা কংক্রিট বেরিয়ে আছে, কোথাও গর্ত ভরে আছে কাদা-পানিতে। সবচেয়ে বেহাল অবস্থা রাজলক্ষ্মী ফুটওভার ব্রিজের নিচের প্রায় ৫০০ মিটার অংশে। রাজলক্ষ্মী বাস স্টপসংলগ্ন এলাকায় সার্ভিস লেনের একটি বড় অংশের পিচ পুরোপুরি উঠে গিয়ে মাটি বেরিয়ে বিস্তীর্ণ অংশ বৃষ্টির পানিতে কর্দমাক্ত হয়ে আছে। এতে যানবাহনের পাশাপাশি পথচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে পানি জমে যায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তা জমে থাকে। এছাড়া জসীমউদ্‌দীন বাস স্টপেজ, আজমপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টের সার্ভিস লেনগুলোতে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্তে পানি জমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় কোথাও কোথাও মাসের পর মাস পানি আটকে থাকে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। দীর্ঘদিন জমে থাকা স্থির পানিতে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ডেঙ্গুর মৌসুমে ঘনবসতিপূর্ণ উত্তরা-আজমপুর এলাকায় সড়কের ওপর এমন জলাবদ্ধতা জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

সার্ভিস লেনের মূল উদ্দেশ্য, মহাসড়কের মূল অংশ সচল রেখে গণপরিবহনকে নির্ধারিত স্থানে নিরাপদে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ দেয়া। কিন্তু জসীমউদ্‌দীন, রাজলক্ষ্মী ও আজমপুরের সার্ভিস লেন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বাসগুলো মূল মহাসড়কের ওপরেই থামছে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। সরজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন পয়েন্টে বাস দাঁড়িয়ে থাকায় যানজট দীর্ঘ হচ্ছে। যাত্রীদেরও চলন্ত বাস, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ফাঁক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ বেশি।

পথচারীরা জানান, এক পাশে দ্রুতগতির যানবাহন, অন্য পাশে কাদা-পানিতে ভরা গর্ত—এমন পরিস্থিতিতে বাসে ওঠানামা করতে গিয়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত বাসের ফাঁক গলে সড়ক পার হতে হচ্ছে। ফলে সার্ভিস লেনের দুরবস্থা এখন শুধু যান চলাচলের সমস্যা নয়, জননিরাপত্তারও বিষয় হয়ে উঠেছে।

সার্ভিস লেন ছেড়ে মূল সড়কে বাস থামানোর কারণ জানতে চাইলে মতিউর রহমান নামের এক বাসচালক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই সার্ভিস লেনগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। খানাখন্দ আর জমে থাকা পানির কারণে সার্ভিস লেন প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী। এর ওপর আবার অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পিকআপসহ নানা ছোট যানবাহন দাঁড়িয়ে থেকে সার্ভিস রোড দখল করে রাখে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পরিস্থিতির কারণে আমাদের মূল সড়কেই গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাতে হয়। কিন্তু এতে করে পেছনে থাকা অন্যান্য যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।’

সরজমিনে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত অংশে কোথাও কোথাও লাল ইট, সুরকি ও বালি ফেলে গর্ত ভরাটের চেষ্টা করা হচ্ছে। ট্রাকে করে নির্মাণসামগ্রী এনে শ্রমিকরা অস্থায়ীভাবে কিছু অংশ মেরামত করছেন। ইট দিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া অংশের সলিংসহ অন্যান্য কাজ করতে দেখা গেছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে বালি ফেলে ভরাট করে কাজ চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলেছে।

কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ওয়ার্কস অ্যাসিস্ট্যান্ট হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘কুর্মিটোলা থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত বিভিন্ন সার্ভিস লেন ও মূল সড়কের যেসব স্থানে পিচ উঠে গেছে, সেগুলো অস্থায়ীভাবে মেরামত করা হচ্ছে। সওজ অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি ফান্ড থেকে এসব মেরামতের কাজ চলছে। এ সড়কের মূল কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম শেষ হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই মূল সড়কসহ অন্যান্য স্থায়ী সংস্কার কার্যক্রম শুরু হতে পারে।’

তবে সামান্য বৃষ্টি ও ভারী যানবাহনের চাপে অস্থায়ী এসব মেরামত কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। তাদের দাবি, শুধু গর্ত ভরাট করে সাময়িক সমাধান নয়; সার্ভিস লেনের পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

মূল সড়কেই পরিবার নিয়ে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তোফাজ্জল নামে একজন স্কুলশিক্ষক। তিনি বলেন, ‘এভাবে মূল সড়কে দাঁড়িয়ে যানবাহনে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। বাসগুলো যদি সার্ভিস লেনে এসে যাত্রীসেবা দিত তাহলে আমাদের মূল সড়কে গিয়ে দাঁড়াতে হতো না।’

সওজ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কিছু জায়গায় সংস্কারকাজ চলতে দেখা গেলেও পুরো অংশের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে সার্ভিস লেনগুলো সচল করা, জমে থাকা পানি নিষ্কাশন এবং নির্ধারিত স্থানে বাস থামানোর ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী যাত্রী ও পরিবহন চালকরা।

এসব বিষয়ে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এগুলো বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অধীন ছিল, তবে প্রকল্পের মেয়াদ না থাকায় এবার এ সিজনেই আমরা ঢাকা জোন থেকে এটি মেরামত করে দেব। বর্তমানে যেহেতু বর্ষা মৌসুম চলছে, তাই অস্থায়ীভাবে সওজ অধিদপ্তরের নিজস্ব উদ্যোগে (ডিপার্টমেন্টাল) মেরামতের কাজ চলছে। বর্ষা পার হলেই অক্টোবরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।’

আরও