চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ‘রাইজিং গ্রুপ’। গ্রুপটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আসলাম চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। তার অবর্তমানে ব্যবসা পরিচালনা করছেন ভাই আমজাদ চৌধুরী। ব্যাংকের দেনা শোধ না করে উল্টো কৌশলে স্বজনদের দিয়ে আবারো ব্যাংকঋণ নিয়েছেন তিনি। তবে এসব ঋণও বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, রাইজিং গ্রুপের নামে প্রায় ১৫টি ব্যাংকের বর্তমান পাওনা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ আদায়ে এখন পর্যন্ত দায়ের করা মামলার সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এসব মামলায় আসলাম চৌধুরী ও তার ভাই আমজাদ চৌধুরীকে বিবাদী করা হয়েছে।
ব্যাংকের মামলায় বিবাদী হিসেবে থাকায় নিজ নামে ঋণ সুবিধা নিতে পারেননি আমজাদ চৌধুরী। ঋণ নিতে তার আপন ভাগিনা, ভাগিনীর জামাই ও শ্যালককে দিয়ে ম্যাস শিপ ব্রেকিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আর এ প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এরই মধ্যে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা নিয়েছেন তিনি। কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং পার্টনার হিসেবে রয়েছেন সরওয়ার হোসেন, পার্টনার হিসেবে আছেন মিনহাজুল হাসান ও শহীদুল হক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরওয়ার হোসেন রাইজিং গ্রুপের কর্ণধার আমজাদ চৌধুরীর আপন ভাগিনা। মিনহাজুল হাসান ভাগিনী জামাই ও শহীদুল হক আমজাদের শ্যালক।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের পর থেকে রাইজিং গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক খেলাপি হতে শুরু করে। ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আসলাম চৌধুরী ও আমজাদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করে। এরপর ২০১৫ সালের মধ্যে রাইজিং গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে স্বজনদের নামে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান আসলাম চৌধুরীর ভাই আমজাদ চৌধুরী। নিজের শ্যালক, ভাগিনা ও ভাগিনী জামাই দিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তার নাম দেন ম্যাস শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ।
এরপর নতুন ব্যাংক হিসেবে ফারমার্স ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে। পুরনো জাহাজ আমদানি করতে এ ঋণ সুবিধা নিলেও মূলত সেই ঋণ চলে গেছে আমজাদ চৌধুরীর পকেটে। এতে আটকে রয়েছে তিন ব্যাংকের প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।
পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) খাতুনগঞ্জ শাখার তথ্যমতে, ২০১৫ সালে পুরনো জাহাজ আমদানির নামে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে ম্যাস শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ। নিয়ম অনুযায়ী শিপ আমদানি শেষে তা বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা সমন্বয় করার কথা। কিন্তু এর মধ্যে পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও ব্যাংকের সেই টাকা আর ফেরত দেয়নি ম্যাস শিপ ব্রেকিংয়ের তিন কর্ণধার।
এর মধ্যে ঋণটি দুবার পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংক। সর্বশেষ গত বছরের (২০১৯ সাল) জুলাইতে ঋণটি পুনঃতফসিল করা হয়। কিন্তু এখন আবারো ঋণটি মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। এ মাসের মধ্যে ঋণের কিস্তি শোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম বলেন, একাধিকবার রিশিডিউল করার পরও প্রতিষ্ঠানটি তিন কর্ণধার ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসছে না। সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে এ মাসে কিস্তি না দিলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। যেই টাকার বিপরীতে মাত্র ৫৫০ শতক জায়গা বন্ধক রয়েছে। এর মধ্যে ১৩৭ শতক জমি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের ইনানী রিসোর্ট নামের প্রতিষ্ঠানটির জায়গা। বাকিগুলো সীতাকুণ্ডের সাগর পারের শিপ ইয়ার্ডের জায়গা। এসব জমি বিক্রি করে পাওনা টাকার অর্ধেকেও উসুল হবে না। বার বার চেষ্টা করেও প্রতিষ্ঠান কর্ণধারদের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ঋণ আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
ব্যাংক কর্মকর্তা ও শিপ ব্রেকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্রয় সূত্রে ইনানী রিসোর্টের মালিক আসলাম ও আমজাদ চৌধুরী। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি হওয়ার পর কৌশলে এ ইনানী রিসোর্টসহ আরো অনেক সম্পত্তি আমজাদের ভাগিনা সরওয়ার হোসেন, ভাগিনী ইসমত জাহান, ভাগিনী জামাই মিনহাজুল হাসানের নামে হেবা করে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকঋণ নেয়ার সময় এ জমিগুলো বন্ধক দেয় তারা।
একই কায়দায় পুরনো জাহাজ আমদানির কথা বলে এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ সুবিধা নিয়েছেন আমজাদ চৌধুরীর এ তিন স্বজন। ২০১৪ সালে নেয়া ঋণের টাকা প্রায় অর্ধযুগেও আর শোধ করা হয়নি। বর্তমানে ম্যাস শিপ ব্রেকিংয়ের কাছে এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ১১২ টাকা। গত কয়েক বছর ধরে এ ঋণ আদায়ের জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা না পাওয়া চলতি বছরের মার্চে এনআই অ্যাক্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের তত্কালীন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রভাব কাটিয়ে ঋণ সুবিধা নিয়েছে ম্যাস শিপ ব্রেকিংয়ের কর্ণধাররা। কিন্তু ঋণ নেয়ার পর থেকে ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসছে না। এমনকি ঋণের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধক রাখা সম্পত্তির পরিমাণও খুব কম। যেই কারণে ঋণ আদায়ে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয়েছে ব্যাংক। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলাও দায়ের করা হবে।
ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্যমতে, এবি ব্যাংকের কর্ণধার মোর্শেদ খানের প্রভাবে আসলাম চৌধুরীর আত্মীয় হিসেবে সহজে ঋণ পেয়েছে ম্যাস শিপ ব্রেকিংয়ের কর্ণধাররা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা বলেন, ম্যাস শিপ ব্রেকিংয়ের তিন কর্ণধার আসলাম চৌধুরী ও আমজাদ চৌধুরীর নিকটাত্মীয়। মূলত স্বজনদের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে এ ঋণ সুবিধা নিয়েছে আমজাদ চৌধুরীর পরিবার।
এবি ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংকের। ব্যাংকটির অলংকার মোড় শাখার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, যদিও আমাদের ঋণটা এখনো খেলাপি হয়নি। তবে ঋণের কিস্তি পরিশোধে বেশ গড়িমসি করছে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বর কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণের কিস্তি না দিলেও তাকে বা সেই প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি করা যাচ্ছে না। তাই আমরা অপেক্ষা করছি।
বিস্তারিত জানতে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং পার্টনার সরওয়ার হোসেনকে একাধিকবার ফোন করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, রাইজিং গ্রুপের প্রায় ১৫ ব্যাংকের দেড় হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৪৬৫ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক হালিশহর শাখার ১৫৮ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পাহাড়তলী শাখার ১৫৩ কোটি, ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১০৫ কোটি, যমুনা ব্যাংক ভাটিয়ারী শাখার ৮২ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৬৯ কোটি, লংকাবাংলা ফিন্যান্সের ৪০ কোটি, ফিনিক্স ফিন্যান্সের ২৩ কোটি, আইআইডিএফসির ১৯ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ২০ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ভাটিয়ারী শাখার প্রায় ৯ কোটি টাকা ছাড়াও সিটি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা, ট্রাস্ট ব্যাংক সিডিএ শাখা থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে।