বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান মূল সমস্যা রোলিং স্টক—লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগনের তীব্র ঘাটতি। গত দেড় দশকে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও এ মৌলিক সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রেল সংস্কারের দাবি জোরালো হলেও এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত এ গণপরিবহন সংস্থায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ সময় বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও আয় বৃদ্ধি ও যাত্রীসেবা উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং রোলিং স্টক ঘাটতির সমাধান না হওয়ায় খাতটি দিন দিন আরো নাজুক অবস্থায় পড়ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে গত দেড় দশকে সরকার ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। রাজস্ব খাতের পাশাপাশি বিদেশী অর্থায়নে নেয়া এসব বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে নতুন রেলপথ নির্মাণ, বিদ্যমান রেলপথ সংস্কার, ওয়ার্কশপ মেরামত, সেতু নির্মাণ, রোলিং স্টক (কোচ ও লোকোমোটিভ) ক্রয়, সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, উদ্ধার ও মেরামত সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং রেলের নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারে। তবে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বাড়তি চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহে কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রেল খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করলেও রেল কর্তৃপক্ষ একের পর এক বৃহৎ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে মনোযোগ দিয়েছে। অথচ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে মাত্র কয়েক দফায় লোকোমোটিভ আমদানি করা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম সংখ্যক লোকোমোটিভ নিয়ে রেলওয়ে কার্যত ধুঁকছে।
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন ও বর্ধিত যাত্রীর চাপ সামাল দিতে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন পরিচালনার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে নতুন ট্র্যাক নির্মাণ, কর্ডলাইন ও ডাবল লাইন স্থাপন এবং পুরনো লাইনের সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যমান রোলিং স্টকের রক্ষণাবেক্ষণে ওয়ার্কশপ সংস্কার ও নির্মাণ, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু এবং সমানতালে রোলিং স্টকের পরিসর বাড়ানো প্রয়োজন। তবে রেলওয়ে সবগুলো বিষয়ে কাজ করলেও লোকোমোটিভ ও কোচ ক্রয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে অনীহা প্রদর্শন করে আসছে।
২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ আয়োজিত একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে রেলওয়ের অবকাঠামো ও রোলিং স্টকের মানোন্নয়ন এবং অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে আয়োজিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সিনিয়র সচিব এমএ আকমল হোসেন আজাদ। সভায় উপস্থাপিত তথ্যে উঠে আসে, বিপুল বিনিয়োগের পরও বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটার গেজ লোকোমোটিভের ৬৯ শতাংশ এরই মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ করেছে। পাশাপাশি ব্রড গেজের ২৭ শতাংশ, মিটার গেজ যাত্রীবাহী কোচের ৪৩ শতাংশ এবং ব্রড গেজ কোচের ৩৪ শতাংশেরও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নেই। এর পরও রেল কর্তৃপক্ষ একের পর এক বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও লোকোমোটিভসহ রোলিং স্টক সংগ্রহে দ্রুত ও বড় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করেনি।
সভায় রেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে কয়েকটি চলমান প্রকল্পের আওতায় সীমিত পরিসরে রোলিং স্টক সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া রোলিং স্টক সংগ্রহে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের রোলিং স্টক সংকট তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ একটি লোকোমোটিভ বা ক্যারেজ ক্রয় করতে গেলে কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হয়। বিশ্ববাজারে মিটার গেজ রেলপথের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় এ ধরনের লোকোমোটিভ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও সীমিত। এ কারণেই রেলওয়ে ব্রড গেজ ও ডুয়াল গেজ রেলপথ নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আপাতত বিদ্যমান লোকোমোটিভগুলো মেরামতের মাধ্যমে সচল রাখার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে চাহিদা অনুযায়ী নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’
রেলের নথিপত্রে বলা হয়েছে, ঢাকা–চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর রুটে ফ্রেইট পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা, ভবিষ্যৎ চাহিদার প্রক্ষেপণ, মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বে-টার্মিনাল নির্মাণের ফলে রেলের ওপর নির্ভরতা বহুগুণে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
কিন্তু দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর বিদ্যমান রেলসংযোগ জোরদারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো নেয়া হয়নি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন রেলপথ সংস্কার ও ডুয়াল গেজে রূপান্তর করা হলেও পণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারহাট–সিজিপিওয়াই–চট্টগ্রাম বন্দর সেকশনটি এখনো ডুয়াল গেজে রূপান্তর না হওয়ায় পণ্য পরিবহন ধীরগতির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। এজন্য পুরনো পণ্য পরিবহন লাইন ছাড়াও বে-টার্মিনাল রেল লিংক, মিরসরাই জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল রেল লিংক ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে।
পরিবহন ও প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণে ঢাকা, পাহাড়তলী ও পার্বতীপুরে মোট চারটি কারখানা এবং দৈনিক অপারেশনাল রক্ষণাবেক্ষণে দুই অঞ্চলে ১৫টি লোকোশেড আছে। ক্যারেজ ও ওয়াগন রক্ষণাবেক্ষণে মোট ১৯টি ক্যারেজ ও ওয়াগন ডিপো থাকলেও সবগুলোই দীর্ঘদিনের পুরনো। ১৯৯২ সালে পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা নির্মাণ হলেও নতুন নতুন রোলিং স্টকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেরামত কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। রেলের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, দড়িপাড়া ও রাজবাড়ীতে দুটি কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো অন্তত এক দশকের বেশি সময় লাগবে। ফলে লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংকটে থাকা রেলওয়ে শুধু দক্ষ কারখানার অভাবে প্রয়োজনীয় মেরামত করছে পারছে না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নানা জটিলতার কারণে উদ্যোগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রোলিং স্টক সংগ্রহ করা যায়নি। এখন দীর্ঘদিনের অবহেলিত অংশগুলোর কাজে হাত দেয়া হয়েছে।’
এদিকে সরকার পরিবর্তনের পর রেলওয়ের সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা এলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। একাধিক দপ্তরের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা সপ্তাহে মাত্র একদিন রেলের বিষয়ে সময় দিচ্ছেন, ফলে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অদক্ষতার ভারে জর্জরিত রেলওয়ে কার্যত আগের মতোই সীমিত সক্ষমতা নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
রেলের অনুমোদিত জনবল কাঠামো ৪৭ হাজার ৭০৩ জন হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছে অর্ধেকেরও কম—মাত্র ২২ হাজার ৭৯০ জন। বিশেষ করে অপারেশনাল জনবল সংকটসহ স্টেশনমাস্টার, লোকোমাস্টার, পোর্টার ও লেভেল ক্রসিং গেটম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল না থাকায় সারা দেশে অন্তত ১৩০টি রেলস্টেশন বন্ধ রয়েছে।
রেলের তথ্যমতে, সড়ক, নৌ, বিমান ও রেলপথের মধ্যে রেলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মোডাল শেয়ার ৫ শতাংশের কম। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার পরিবহনের সুযোগ থাকলেও লোকোমোটিভ সংকটে এ খাতে রেলের শেয়ার মাত্র ৩ শতাংশ এবং বার্ষিক আয় ১১৫ কোটি টাকা (২০২৩-২৪ অর্থবছর)। এজন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা, মোংলা বন্দর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে কনটেইনার পরিবহনের লক্ষ্যে নিমতলীতে আইসিডি নির্মাণে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলেও রেলওয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ বলছে, রেলের গুরুত্বপূর্ণ ৮-১০টি বড় সেতু এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব সেতু দিয়ে ভারী পণ্যবাহী ও কনটেইনার ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু রেলের বিগত দেড় দশকের বিনিয়োগে এসব সেতু সংস্কার কিংবা নতুন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নতুন নির্মাণ হলেও কর্ণফুলী নদীতে শতবর্ষী কালুরঘাট সেতুর স্থলে নতুন সেতু নির্মাণ না করায় ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। মূলত অদূরদর্শিতা ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ভিড়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে পিছিয়ে রয়েছে রেলওয়ে। এর মধ্যে রোলিং স্টকের তীব্র ঘাটতির কারণে বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলওয়ে এখন যাত্রীসেবা বৃদ্ধির পরিবর্তে ধুঁকছে বলে মনে করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।