বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খড়, ভুসি ও অন্যান্য খাদ্য কিনতে হচ্ছে; যার দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে লালন-পালন করা গরু আগেভাগেই কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। এতে তাদের লাভের আশা অপূর্ণই থাকছে, উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে অনেককে।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার কৃষক মো. নাসির। কোরবানির ঈদকে লক্ষ্য করে তিনি দুটি দেশী ষাঁড় লালন-পালন করেছিলেন। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝির বন্যায় তার ধান তলিয়ে যায়। কোনো রকমে কিছু কাটতে পারলেও খড় তুলতে পারেননি। ফলে আগে থেকেই গরুর খাবার নিয়ে সংকট থাকায় তিনি গত সপ্তাহে একটি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। মো. নাসির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৮৫ হাজার টাকায় গরুটি বিক্রি করলেও ঈদের কাছাকাছি সময় হলে আরো অনেক বেশি দাম পাওয়া যেত।’
এবারের বন্যায় হাওরের প্রায় সব কৃষকই কম-বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর আবার কোথাও গলাপানিতে নেমেও ধান কেটে কোনোমতে ঘরে তোলার চেষ্টা করেছেন। যদিও বেশির ভাগ কৃষকই চাষের একটি অংশের ফসল হারিয়েছেন। আর পানি বেড়ে যাওয়ায় শুধু ধান ঘরে তোলার চেষ্টা করলেও খড় নিয়ে ভাবার সময় পাননি। এতে গোখাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায়। গত কয়েক দিন থেকে অবশ্য ভারি বর্ষণ নেই। তাই নামতে শুরু করেছে হাওরাঞ্চলের পানি। এতে ক্ষতির চিহ্নও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার ভাটিয়া এলাকায় গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, একটি ধানের খলায় বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ ধান শুকাচ্ছেন। সেখানেই কথা হয় কৃষক আজহারুল ইসলামের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে জানান, খড় সংকটের কারণে তিনি তার গরুটি বিক্রি করে দিয়েছেন।
আজহারুল ইসলাম জানান, ডিঙ্গাপোতা হাওরে এবার ১৫ কাঠা (১৫০ শতাংশ) জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। সব ধানই তলিয়ে গেছে। এতে নিজেদের খোরাক জোগানো নিয়ে সংকটে পড়েছেন। একই সঙ্গে গরুর খাদ্য সংকট হওয়ায় তিনি তার গরু ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন।
গোখাদ্য সংকটের কারণে খড়ের দাম ও চাহিদাও বেড়েছে। নেত্রকোনার মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. দিলাল মিয়ার গরুর খামার রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি জানান, এ মৌসুমে কিছু খড় কিনেছেন। প্রতি কাঠা জমির খড় কিনতে তার ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। আগে এর জন্য ব্যয় হতো ৫০০-৬০০ টাকা।
নেত্রকোনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, জেলায় এবার কোরবানি উপযোগী ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৮টি গবাদিপশু রয়েছে। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৮৪ হাজার ৫৭৮ ও মহিষ ২১৪টি।
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরেও গোখাদ্য সংকটে অনেকে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। উপজেলার শামীম নামে এক কৃষক সম্প্রতি অপেক্ষাকৃত কম দামেই গরু বিক্রি করে দিয়েছেন বলে জানান।
জেলার ধর্মপাশা উপজেলার শেলবরষ এলাকার মো. মতি মিয়া বলেন, ‘আট কানি ধান লাগিয়েছিলাম নয়াবিলে (হাওর)। দেড়শ মণের মতো ধান হয়েছে। সব ধান কাটতে পারলেও ধান ও খড় শুকানো যায়নি। ২০ দিন হয়েছে ধান কেটেছি, কিন্তু খড় এখনো পড়ে আছে। সব পচে গেছে। ভেবেছিলাম ধান বিক্রি করে গরু কিনব। কিন্তু খড় নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছে।’
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম অবশ্য বণিক বার্তার কাছে দাবি করেন, তার এলাকায় কোনো গোখাদ্য সংকট নেই। সংকট হলেও ভবিষ্যতে হতে পারে, তবে এখন নেই। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গোখাদ্য সংকটে গরু বিক্রি করে দিচ্ছি বিষয়টি এমন না। ঈদের খুব বেশিদিন বাকি নেই, সেজন্য যাদের গরু বিক্রি উপযোগী হয়েছে তারা লাভ পেয়ে বিক্রি করে দিচ্ছেন।’
সুনামগঞ্জে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত আছে ৫৩ হাজার ৪০১টি। এর মধ্যে গরু ৩৯ হাজার ৯৬০ ও মহিষ ৪১৫টি।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, নেত্রকোনা জেলায় মোট বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে। অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৬৫ হেক্টর জমির ধান। উৎপাদনে মোট ক্ষতি ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ টন, যার আর্থিক মূল্য ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৭৭ হাজার ৩৬৩ জন। অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ জেলায় জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর। চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির ধান। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা।