সুনামগঞ্জের ১৯ নদীতে নাব্য সংকট, বন্ধ নৌপথ

হাওর, নদী, খাল ও জলাভূমি সুনামগঞ্জের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও চালিকাশক্তি।

হাওর, নদী, খাল ও জলাভূমি সুনামগঞ্জের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও চালিকাশক্তি। এ অঞ্চলের জীবন-জীবিকার বিকাশে ও জমির বহুমুখী ব্যবহারের অতিরিক্ত চাপকে প্রশমিত করতে নদী ও হাওরের পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলের নদী ও হাওরে পানি কম থাকে। তবে এ বছর আগেভাগেই ১২টি উপজেলার ১৯টি নদীতে নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে পুরাতন সুরমা, রক্তি, দাড়াইন ও সোমেশ্বরীসহ অন্তত চারটি নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। পানি কমে যাওয়ায় জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, মধ্যনগর, ধর্মপাশা, দিরাই ও শাল্লা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে নদী পারাপার ও কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়রা বলছেন, অনেক নদীতে এখন কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পানি রয়েছে। নৌপথনির্ভর জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলায় নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে একাধিক ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। এসব চরে প্রায়ই বালি-পাথর ও কয়লা বহনকারী নৌযান আটকে যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।

হাওরের কৃষকরা জানান, পুরাতন সুরমা ও দাড়াইন নদীতে আগে বড় নৌযান চলাচল করত। এখন আর চলতে পারে না। পাহাড়ি ছড়া দিয়ে নেমে আসা বালিতে নদী ভরাট হয়ে গেছে। নদীর বিভিন্ন অংশ দখল হয়েছে। দাড়াইন নদীর শত কিলোমিটার নৌপথজুড়ে নাব্য সংকট রয়েছে। শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না। বৈশাখ মাসে পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় বিলীন হয়ে যায় ফসলি জমি। এ নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটারজুড়ে চর জেগেছে। নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া সোমেশ্বরী, রক্তিসহ জেলার ১৯টি নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় নদীর অনেক স্থানে ধান চাষ করা হচ্ছে। পলি পড়ে রীতিমতো সীমান্ত নদীসহ এসব নদীগুলো খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। নদীর বৈরী আচরণের কারণে ঠিকমতো ফসল ঘরে উঠাতে পারেন না শাল্লার কৃষকরা। নাব্য সংকটে শাল্লা উপজেলার দাড়াইন নদী একেবারে শুকিয়ে গেছে। পুরাতন সুরমাও ভরাট হয়ে নৌ চলাচল তো দূরের কথা, খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এ নদীতে ধান রোপণও করেছেন।

জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার বাণিজ্যিক মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। এ উপজেলার নদীগুলোয় একাধিক ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। এসব ডুবোচরে প্রায়ই বালি-পাথর ও কয়লাবাহী নৌযান আটকে যাচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত নদী খননের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরাসহ হাওরবাসী।

কয়লা ব্যবসায়ী নীরব হোসেন জানান, তাহিরপুর সীমান্ত দিয়ে এলসির মাধ্যমে তিনি কয়লা আনেন। পরে সেগুলো নদীপথে কিশোরগঞ্জে নিতে গিয়ে মাঝপথে বাল্কহেড আটকে যায়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে সুরমা, বাউলাই, রক্তি, ধনু, চামতি, ঘোরাউত্রা, আপার মেঘনা, সোমেশ্বরীসহ ১৯টি নদীর পানি তলানিতে নেমেছে। ফলে ১২টি উপজেলাজুড়ে প্রকট নাব্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২) এমদাদ হোসেন জানান, নাব্য ফিরিয়ে আনতে ১৯টি নদী ড্রেজিংয়ের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়ন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে দ্রুত খননকাজ শুরু করা হবে।

হাওর নিয়ে কাজ করা সংগঠন হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউজ) নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর বন্যায় নদী ও কৃষিজমিতে পলি জমে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সীমান্তবর্তী অনেক এলাকায় কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি হাওরাঞ্চলকে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্লানের আওতায় এনে পরিকল্পিতভাবে নদী খনন ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দেন।

নদীগুলোর নাব্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু নৌপথই নয়, কৃষি, বাণিজ্য ও হাওরাঞ্চলের সামগ্রিক জীবন-জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাই ব্যবসায়ী, কৃষক ও হাওরবাসী দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছেন।

আরও