সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে পাম অয়েলের ব্যবহার আরো বেড়েছে

দেশে ভোজ্যতেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় পাম অয়েল। মূল্যস্ফীতি ও বাজার পরিস্থিতির কারণে ভোক্তাদের মধ্যে এর ব্যবহার আরো বেড়েছে। সেই তুলনায় কমছে তুলনামূলক কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলের ব্যবহার। কভিড মহামারীর কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছুটা ছেদ পড়ায় ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় সব নিত্যপণ্যেরই দাম

দেশে ভোজ্যতেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় পাম অয়েল। মূল্যস্ফীতি বাজার পরিস্থিতির কারণে ভোক্তাদের মধ্যে এর ব্যবহার আরো বেড়েছে। সেই তুলনায় কমছে তুলনামূলক কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলের ব্যবহার। কভিড মহামারীর কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছুটা ছেদ পড়ায় ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় সব নিত্যপণ্যেরই দাম বাড়তে শুরু করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীল করে তোলে ভোজ্যতেলের বাজার। দেশের বাজারেও কয়েক ধাপে দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তাই সয়াবিন ছেড়ে কিছুটা কম দামি পাম অয়েলের দিকে ঝুঁকছে মধ্যবিত্ত ভোক্তারাও।

দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন। এর মধ্যে পাম অয়েল সয়াবিন তেলের ৯০ শতাংশই পূরণ করতে হয় আমদানির মাধ্যমে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে লাখ ২১ হাজার ৯২২ টন। আর পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ১৩ হাজার ৬২ টন। এছাড়া সয়াবিন বীজ লাখ ১৪ হাজার ১৯৯ টন আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে অপরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ১২ হাজার টন। পরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয় লাখ ৫২ হাজার ৬০ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিশোধিত পাম অয়েলের আমদানি হয়েছিল লাখ ৯১ হাজার ৮৬৪ টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চবিত্তরা সয়াবিন তেলের ব্যবহার করলেও নিম্ন-মধ্য নিম্নবিত্তরা খরচ বাঁচাতে বাজারের খোলা সয়াবিন তেল কিনছেন। আর এসবের বেশির ভাগই পাম অয়েল বলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। ফলে বোতলজাত তেলের চেয়ে খোলা তেলের প্রতি মানুষের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাম অয়েলের চাহিদাও বেড়েছে। এছাড়া গ্রীষ্মকালে পাম অয়েল না জমায় শহরে বা গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে অনেক ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় সেটি সয়াবিনের দামেই বিক্রি করে। সম্প্রতি তেলবীজ পণ্য নিয়ে মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বার্ষিক প্রতিবেদনেও  তথ্য উঠে এসেছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে খোলা সয়াবিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আমাদের কাছে তথ্য আছে, বাজারে যে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে তা সবই পাম অয়েল। এগুলো টেস্ট করে মূলত বিএসটিআই। আমাদের পক্ষ থেকে বাজার পরিদর্শন অব্যাহত রয়েছে।

রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রিয়াজ হোসেন। তিনিসহ মোট ১০ জন মেসে থেকে পড়াশোনা করছেন। অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় খরচ কমাতে তারা খোলা সয়াবিন তেল ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। তাই সবকিছুতে কীভাবে খরচ কমানো যায় সেই চিন্তা করতে হয়। যদিও বাজারে খোলা তেল কম। তার পরও যেখানে আছে সেখান থেকে কিনি। এতে পাঁচ কেজিতে অন্তত ৭০-৮০ টাকা বেঁচে যায়।

বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৭০-১৭৫ টাকায়। বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৮০-১৮৫ টাকায়। আর পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ১২৫-১৩৫ টাকায়। দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২১ সালের মার্চ মাসে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে মাত্র ১১১-১১৬ টাকায়। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৩০-১৩৫ টাকা। আর একই সময়ে পাম অয়েলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১০০-১০৫ টাকা। অর্থাৎ একই সময়ে পাম অয়েলের চেয়ে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।

দেশে আমদানীকৃত সয়াবিন তেলের ৪৭ শতাংশই আসে আর্জেন্টিনা থেকে। আর ব্রাজিল থেকে ৩৯ শতাংশ, প্যারাগুয়ে থেকে ১১ এবং অন্যান্য উৎস থেকে আমদানি করা হয় শতাংশ। অন্যদিকে পাম অয়েলের ৮৮ শতাংশ আমদানি করা হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে। বাকি ১২ শতাংশ আমদানি হয় মালয়েশিয়া থেকে।

আমদানিকারকরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে জাহাজ ভাড়া প্রায় চার গুণ বেড়েছে। সে হিসেবে আর্জেন্টিনা ব্রাজিল থেকে সয়াবিন আনতে সময় এবং পরিবহন ভাড়া অনেক বেশি পড়ে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়ার সঙ্গে দূরত্ব কম হওয়ায় পরিবহন ভাড়া সময় দুটোই কম প্রয়োজন হয়। এতে তুলনামূলক সয়াবিনের চেয়ে পাম অয়েলের দাম অনেক কমে যায়।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, আসলে কোন তেলের চাহিদা বেড়েছে বা কমেছে এর কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। রমজানে পাম অয়েলের চাহিদা বেশি থাকে। ভাজাপোড়ার বেশির ভাগই পাম অয়েল দিয়ে করা হয়। সয়াবিন তেল ভেজে একদিনের বেশি রাখা যায় না। সে কারণে হোটেল-রেস্তোরাঁয় পাম অয়েলই বেশি ব্যবহার করা হয়। সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। ফলে অনেকে খরচ বাঁচাতে পাম অয়েলের ব্যবহার করছে। কারণে হয়তো পাম অয়েলের ব্যবহার বেড়ে গেছে।

কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি . গোলাম রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, পাম অয়েল আমদানি হয় বেশি। বিক্রি হয় কম। আবার সয়াবিন আমদানি হয় কম, বিক্রি হয় বেশি। বাজারে গিয়ে আলাদা পাম অয়েল কিন্তু খুব একটা পাওয়া যায় না। তাহলে বাকিটা কোথায়, সেটা একটা প্রশ্ন থেকে যায়। বিভিন্ন সময় আমরা শুনেছি এগুলো সয়াবিন হিসেবেই মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকিও থাকে ভোক্তাদের। আবার ভোক্তাদের মধ্যে অনেকে খোলা তেলে ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক . মো. আব্দুল আলীম বণিক বার্তাকে বলেন, খোলা সয়াবিন এবং পাম অয়েল বন্ধ করা হয়েছে। যারা এখন খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি করছে তারা অবৈধভাবে বিক্রি করছে। এটা তদারকির দায়িত্ব মূলত বিএসটিআইয়ের। তবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। আমরা বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে সতর্ক করছি। আমাদের নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

আরও