সাইবার অপরাধের অভিনব ও বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন ই-ট্রানজেকশন, হ্যাকিং ও অনলাইনে প্রতারণা। এসব অপরাধের মূল লক্ষ্য কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করা। এ ধরনের অপরাধে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোও আক্রান্ত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর্থিকভাবেও। আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ও অপরাধ শনাক্তে বিলম্বের কারণে অর্থসংক্রান্ত অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও তদন্তে দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে এসব অপরাধ মোকাবেলা করতে চায় পুলিশ।
ঢাকার সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে চারটি ভিন্ন আইনের অধীনে প্রতি মাসে গড়ে ১৬৯টি সাইবার-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। ২০২১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ১৯৪। আর গত বছর এটি আরো বেড়েছে। ২০২২ সালে সাইবার-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩১৩টি। এর মধ্যে ২৮০টি মামলা তদন্ত করে সিটিটিসি। এসব মামলার মধ্যে ফেসবুক-সংক্রান্ত মানহানির ৯১টি ও পর্নোগ্রাফির মামলা ৫৮টি। এর বাইরে হ্যাকিং-সংক্রান্ত ৫১টি, ই-ট্রানজেকশনের ৪২, অনলাইন প্রতারণায় ২০ ও তথ্যপ্রযুক্তির মামলা ১৮টি। তথ্যপ্রযুক্তি, অনলাইন প্রতারণা, ই-ট্রানজেকশন ও হাকিংয়ের ঘটনায় দায়ের হওয়া ১৩১টি মামলার সবগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল অর্থ হাতিয়ে নেয়া, যা সাইবার-সংক্রান্ত মোট মামলার ৪৭ শতাংশ।
ডিএমপির পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিনিয়তই ঘটছে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ডিজিটাল অপরাধের ঘটনা। জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ, আর্থিক জালিয়াতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে দেয়ার আশ্বাস এবং আবাসন ব্যবসাসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সাইবার অপরাধের মধ্যে বিকাশ-নগদ-রকেটের মতো আর্থিক লেনদেনে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট এবং এটিএম বুথ হ্যাকিংয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। এছাড়া ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, বুমবুম, কিউকম, ধামাকাসহ এমন বেশকিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের পণ্য প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও সাম্প্রতিক বছরে ঘটেছে। এছাড়া সাইবার অপরাধের মধ্যে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটের তথ্য জালিয়াতি করে জাল সনদ তৈরি, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ও প্রতারণা, অনলাইনে প্রশ্ন ফাঁস করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অপরাধও রয়েছে। এর বাইরে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমেও দেশে সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব অপরাধের উদ্দেশ্যও অর্থ হাতিয়ে নেয়া।
সাইবার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং এর কারণ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বেশকিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। ঢাকার অপরাধ বৃদ্ধি ও পরিবর্তনের যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, তার মধ্যে রয়েছে নগরবাসীর আর্থসামাজিক অবস্থা, অতিদ্রুত অবকাঠামোগত পরিবর্তন, প্রতিবেশী সংস্কৃতির বিলুপ্তি এবং বিপুলসংখ্যক ভাসমান ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর বিস্তার। রাজধানীর যেসব এলাকায় নিম্ন আয় ও ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি সেখানে অপরাধের ঘটনা বেশি ঘটছে। এর বহুমুখী কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দরিদ্রতা ও অপরাধপ্রবণতা। অঞ্চলভেদে মানুষের জীবনচিত্র ও তাদের কর্মসংস্থানের উৎস, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতিও জড়িত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সামাজিক বৈষম্য দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ধনীরা যেমন দিন দিন আরো বেশি সম্পদশালী হয়ে উঠছে, তেমনি এর বিপরীতে দরিদ্ররা আরো বেশি দরিদ্র হয়ে পড়ছে। ফলে শ্রেণীবৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করছে, এতে সামাজিক চাপ বাড়ছে। এ কারণে অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবারকেন্দ্রিক আর্থিক অপরাধগুলোর পেছনে বেশ কয়েকটি পক্ষ কাজ করে। এ ধরনের চক্রগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করতে না পারলে তারা একই ধরনের অপরাধ বারবার করতে থাকে। এক্ষেত্রে শাস্তি থেকে পার পেয়ে যাওয়া অপরাধীদের দেখে অন্যরাও এসব অপরাধে উৎসাহিত হয়। অর্থসংক্রান্ত এসব অপরাধ মোকাবেলা করতে হলে উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ফরেনসিক তদন্তসংক্রান্ত দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের বিশেষায়িত ইউনিটের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধী শনাক্ত এবং সঠিক তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।
এদিকে অর্থসংক্রান্ত সাইবারজগতের ক্রমবর্ধমান অপরাধ মোকাবেলায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ডিএমপি। সিডিএমএস, সিআইএমএস ও এসআইভিএস প্লাসের মতো আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে অপরাধ ও অপরাধীদের পর্যালোচনা করে এটি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) একেএম হাজিফ আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীতে ম্যানুয়াল অপরাধ কমে গেছে। বেড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন অপরাধ। এসব অপরাধ ম্যানুয়াল সোর্স দিয়ে প্রতিরোধ বা অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করা কঠিন। প্রায় সময়ই তাদের আইনের আওতায় আনা যায় না। বিশেষ করে এখন অপরাধীরা ম্যানুয়ালভাবে অপরাধ করতেও বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এসব অপরাধ মোকাবেলায় বিভিন্ন উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে।’
উদাহরণ তুলে ধরে ডিএমপির এ অতিরিক্ত কমিশনার আরো বলেন, ‘হত্যা বা ধর্ষণের মামলাগুলোর ক্ষেত্রে অপরাধীদের খুব দ্রুত শনাক্ত করা যায়। কিন্তু অর্থসংক্রান্ত অপরাধগুলো শনাক্ত করা বেশ জটিল। এ ধরনের অপরাধ একটা সংঘটিত হয়েই যে থেমে যায়, তেমনটিও নয়। বরং অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ বারবার ঘটতে থাকে। এটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য হুমকি। আর্থিক এসব অপরাধের ঘটনা তদন্তে বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। অপরাধ ঘটিয়ে এখন আর পালিয়ে থাকার সুযোগ নেই।’