গভীর নলকূপ এবং মিঠাপানির উৎস না থাকায় লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতে হয় বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকার মানুষকে। সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে গত ১৪ বছরে। তার পরও সংকট রয়েই গেছে। অবশ্য জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লবণাক্ত এলাকার মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে অনেক পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে ১৭ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা, রামপাল উপজেলায় গভীর নলকূপ একেবারেই অকার্যকর। বাগেরহাট সদর উপজেলার বেশকিছু এলাকায়ও গভীর নলকূপ নেই। তাই এসব এলাকার সাধারণ মানুষকে সুপেয় পানির জন্য পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) অথবা বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। যাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে তারা ট্যাংকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখে। আর দরিদ্র মানুষকে অনেক দূর থেকে হেঁটে পিএসএফের পানি সংগ্রহ করে সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে হয়।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার ঘষিয়াখালী গ্রামে গভীর-অগভীর নলকূপ ও পর্যাপ্ত মিঠাপানির পুকুর না থাকায় ২৬ বছর ধরে নদীনালা ও পুকুরের পানি ফুটিয়ে পান করেন হাফিজা বেগম। এজন্য অনেক সময় আক্রান্ত হতে হয় পানিবাহিত নানা রোগে। উপজেলার সবচেয়ে বেশি লবণাক্ত পানি পান করতে হয় বহরবুনিয়া ইউনিয়ন, পঞ্চকরণ ইউনিয়ন ও জিউধরা ইউনিয়নের মানুষকে। সুপেয় পানি সংরক্ষণে বেশি বেশি পুকুর খনন ও পানির ট্যাংক স্থাপনে সরকারের কাছে দাবি জানান এলাকাবাসী।
মোরেলগঞ্জ বহরবুনিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আলামিন ফকির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিন দিকে নদীবেষ্টিত বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের প্রায় ৩২ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র চারটি সরকারি পুকুর। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন পাত্রে পানি সংগ্রহ করে রাখা হয়। মাত্র কয়েক মাস পর আবারো সুপেয় পানি সংকটে পড়তে হয়।’
সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খুড়িয়াখালী গ্রামে তিন হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এই গ্রাম দুদিক নদীবেষ্টিত। গ্রামের মানুষকে মাইলের পর মাইল হেঁটে সুপেয় পানি সংগ্রহ করে প্রতিদিনের কাজ মেটাতে হয়। সরকার এ এলাকায় পানির ট্যাংক সরবরাহ করায় সুপেয় পানির সংকট কিছুটা মিটেছে। শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার লেগে যায়। শুষ্ক মৌসুমের কারণে পুকুর ও খাল-বিলও শুকিয়ে গেছে। যে কারণে সংকট আরো প্রকট হয়েছে। বাড়ছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ।
এদিকে ভূ-অভ্যন্তরের প্রতিবন্ধকতা ও কারিগরি সক্ষমতা না থাকায় বাগেরহাট জেলার ছয়টি উপজেলায় গভীর নলকূপ স্থাপনের সুযোগ নেই। অন্যদিকে অগভীর নলকূপের পানি লবণাক্ত ও আর্সেনিকযুক্ত। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানি ট্যাংকে সংরক্ষণ করে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা ছাড়া বিকল্প নেই এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জেলার ছয় উপজেলায় ১০ হাজার ট্যাংক স্থাপন করেছে। এসব অঞ্চলের বাসিন্দাদের দাবি, প্রতিটি বাড়িতে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ট্যাংক স্থাপন করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাগেরহাটের মানুষের সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে ৫০০ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৩২০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, ২৫ হাজার ৬০৬টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং নির্মাণ, ১৫৫টি সোলার পিএসএফ নির্মাণ, ৭৫টি ন্যানো ফিল্টার স্থাপন, ১০টি রিভার্স অসমোসিস স্থাপন, ১৯৫টি পুকুর পুনঃখনন, ১৬০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ, ১৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। পাঁচটি পাবলিক টয়েলেট, পাঁচটি উৎপাদক নলকূপ স্থাপন, একটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, একটি ওভার গেড ট্যাংক নির্মাণ, একটি গ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার, বিভিন্ন ব্যাসের ৭০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত কুমার মল্লিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানকার বেশির ভাগ উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানিতে ক্লোরাইড ও আর্সেনিকের মাত্রা অনেক বেশি হওয়ায় গভীর নলকূপ অকার্যকর। জনস্বাস্থ্য বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলাগুলোয় হাউজহোল্ডভিত্তিক রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম কাজ করা হয়েছে। জেলা পরিষদের মালিকানাধীন পুকুরগুলোকে পুনঃখননের মাধ্যমে সোলার পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) স্থাপন করা হয়। কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা মিনিপাইপ ওয়াটার সাপ্লাই স্কিমের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা গেলে পানির সমস্যা সমাধান হবে।