কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত

ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে আসছে মৃত জেলিফিশ, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

জেলিফিশ সামুদ্রিক প্রাণী হলেও মাছ নয়। এরা এক ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এদের শরীর স্বচ্ছ ও জেলি বা জেলটিনযুক্ত, যা জলের গভীরে ভেসে থাকতে সাহায্য করে।

জেলিফিশ সামুদ্রিক প্রাণী হলেও মাছ নয়। এরা এক ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এদের শরীর স্বচ্ছ ও জেলি বা জেলটিনযুক্ত, যা জলের গভীরে ভেসে থাকতে সাহায্য করে। জেলিফিশ কচ্ছপের প্রধান খাদ্য। তবে সাগরে কচ্ছপের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের বিস্তার বেড়েছে। ১৫ দিন ধরে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত জেলিফিশ। ঢেউয়ের সঙ্গে আসা এসব জেলিফিশ ছড়িয়ে পড়ছে সৈকতের বিশাল এলাকাজুড়ে। এদের উপদ্রবে জেলেদের মাছ ধরা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সৈকতের পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কাও করছেন পরিবেশবিদরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলিফিশ সমুদ্রের একটি প্রাকৃতিক প্রাণী ও সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এরা মূলত অতিক্ষুদ্র প্ল্যাংকটন খেয়ে বেঁচে থাকে ও নিজে আবার কচ্ছপ, কিছু মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রধান খাবারের একটি হলো জেলিফিশ। সাগরে কচ্ছপসহ জেলিফিশভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এর বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। পাশাপাশি সাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অক্সিজেনের ঘাটতি ও দূষণ জেলিফিশের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে সহায়তা করছে। জেলিফিশের আধিক্য অনেক সময় সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সতর্ক সংকেত হিসেবেও ধরা হয়।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সাগরের স্রোতের গতিপথে পরিবর্তন আসে। এ সময় প্রজননের জন্য উপযোগী লবণাক্ততা ও পর্যাপ্ত আলোর সন্ধানে জেলিফিশ উপকূলের দিকে চলে আসে। এ সময়ে জেলেদের জালে ব্যাপকভাবে জেলিফিশ আটকা পড়ে। পরিকল্পিতভাবে যদি সামুদ্রিক কচ্ছপ অবমুক্তকরণ কর্মসূচি পালন করা যায়, তাহলে প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র পুনরুদ্ধার হবে ও দীর্ঘমেয়াদে জেলিফিশের আধিক্য কমিয়ে জেলেদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

সাগরপাড়ের জেলেরা জানান, সমুদ্রের পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় জোয়ারের সঙ্গে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত ও জীবিত জেলিফিশ। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের দীর্ঘ ২২ কিলোমিটারের একাধিক পয়েন্টে এসব জেলিফিশ বালিতে আটকে থাকতে দেখা গেছে। ৪-১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সৈকতের বিভিন্ন স্থানে মৃত জেলিফিশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। জেলেদের জালেও অসংখ্য জেলিফিশ উঠে আসছে। যে পরিমাণ জেলিফিশে ধরা পড়ছে তাতে জাল নিয়ে কিনারে আসতে পারছেন না জেলেরা। মাছ ধরার জালে হাজার হাজার জেলিফিশ আটকে পড়ায় জাল নষ্ট হচ্ছে ও মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন অনেকে।

সরজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে আসা জেলিফিশগুলোর কোনোটি আকারে ছোট, আবার কোনোটি বেশ বড়। দেখতে অনেকটা অক্টোপাসের মতো হলেও স্থানীয় জেলেদের কাছে এগুলো ‘লোনা নামে পরিচিত। দুর্গন্ধের কারণে পর্যটকরা কাছে গিয়ে এসব জেলিফিশ দেখতে পারছেন না। কেউ কেউ বাতাসের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে দেখছেন। এভাবে মৃত জেলিফিশ ছড়িয়ে থাকলে পুরো সৈকতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যটক রাব্বি বলেন, ‘জেলিফিশের নাম শুনেছি, কিন্তু এ প্রথম এত কাছ থেকে দেখলাম। তবে এগুলো দ্রুত সরিয়ে না নিলে সৈকতের পরিবেশ দূষিত হবে।’

জেলিফিশ শুধু পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে না, সাগরে জেলেদের মাছ ধরাও ব্যাহত করছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা জানান, জালে মাছের চেয়ে জেলিফিশই বেশি উঠছে। জাল পরিষ্কার করতেই সময় চলে যায়, মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলে কিছু জেলিফিশ আসে, কিন্তু এবার দুই সপ্তাহ আগেই সাগর ভরে গেছে। এমন অবস্থা আগে কখনো দেখেননি তারা।

স্থানীয় জেলে মো. জলিল জানান, প্রতিদিনই তাদের জালে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ ধরা পড়েছে। জাল থেকে সেগুলো তারা সমুদ্রে ফেলে দেন।

গবেষকদের মতে, জেলিফিশ বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে। এদের শরীরে বিশেষ ধরনের দংশন কোষ রয়েছে, যা স্পর্শ করলে ত্বকে চুলকানি, ঘা এমনকি মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদিও উন্নত দেশে জেলিফিশ খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (ওপর) যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, ‘মৃত জেলিফিশগুলো পচে সৈকতে পড়ে থাকলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এগুলো কেন মারা যাচ্ছে, সে বিষয়ে গবেষণা জরুরি।’

এর আগেও ২০১০ সালের জানুয়ারিতে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে অসংখ্য জেলিফিশ ভেসে এসেছিল। কুয়াকাটার ডলফিন রক্ষা কমিটির সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘জেলিফিশ সামুদ্রিক খাদ্যচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের অস্বাভাবিক মৃত্যু ডলফিনসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।’

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে অসংখ্য জেলিফিশ বালিতে আটকে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এগুলো বালির নিচে চাপা দিলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর ঝুঁকি কমবে।’

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘জেলেদের জালে আটকা পড়ে মারা যাওয়া জেলিফিশগুলো সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়। পরে সেগুলো ভেসে সৈকতের বেলাভূমিতে আটকে পড়ছে।’

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসিন সাদেক জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য মৃত জেলিফিশগুলো দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

আরও