কাগজে-কলমেই ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’

টিলা কেটে ও জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত নগরী

কেবল কাগজে-কলমে আর আইনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (সিউক) গঠনের কাজ।

কেবল কাগজে-কলমে আর আইনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (সিউক) গঠনের কাজ। তৈরি করা হয়নি সংস্থাটির অর্গানোগ্রাম, দেয়া হয়নি বাজেট বরাদ্দ। ফলে শুরু করা যাচ্ছে না সংস্থাটির কার্যক্রম। টিলা কেটে ও জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত নগরী। এটি নিয়ন্ত্রণে সিউকের কার্যক্রম দ্রুত শুরু হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পিত ও আধুনিক সিলেট নগরী গড়ার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২৩। আইন পাস হওয়ার প্রায় দুই বছর পেরোতে চললেও কোনো অগ্রগতি নেই সংস্থাটির কার্যক্রমের। আদৌ কবে কার্যক্রম শুরু হবে এ নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। অফিস স্থাপন কিংবা জনবল নিয়োগ হয়নি। অন্যদিকে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ রোধ ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে সিউকের কার্যক্রম চালু করা খুবই জরুরি। নইলে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত সিলেট নগরবাসীকে এর চরম মূল্য দিতে হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) ও আশপাশের এলাকার সমন্বয়ে ২০২২ সালে সিউক গঠনের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। এরই লক্ষ্যে ২০২২ সালের ২২ আগস্ট তৎকালীন মন্ত্রিসভা সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২২-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২৩’। একই বছরের ২৩ নভেম্বর আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু একটি সংস্থা চালু করতে আনুষঙ্গিক যত কাজ প্রয়োজন, সেগুলো তারা করে যায়নি।

সিলেটে টিলা কেটে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার খবর প্রায়ই আসে সংবাদমাধ্যমে। একসময়ের পুকুরের নগরী খ্যাত সিলেটের পুকুর ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে ভবন। সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজারের মালনীছড়া ও আলীবাহার চা বাগান এলাকায় ‘লন্ডনি টিলা’সহ ছয়টি টিলা কেটে সেখানে ‘জাহাঙ্গীরনগর আবাসিক এলাকা’ গড়ে তোলার খবর গত বছর সংবাদমাধ্যমে এলে তা বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। 

নগরীর বালুচর, করের পাড়া, আখালিয়া, ব্রাহ্মণশাসন, গ্রিনসিটি, দুসকি, জাহাঙ্গীরনগর, বড়গুল, গুচ্ছগ্রাম, বাহুবল, বহর কলোনি, আলবারাকা, মেজরটিলা, ফাল্গুনী ও জোনাকী এলাকায় টিলা কেটে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়। হাওলাদারপাড়ার মজুমদার টিলার চারপাশে ‘শান্তিনিকেতন আবাসিক এলাকা’ গড়ে উঠেছে। খাদিমনগর বহর কলোনির পশ্চিমে খাদিম চা বাগানের টিলা কেটে ভরাট করা হয় পাশের একটি পুকুর।

সরজমিনে দেখা গেছে, সিলেট নগরীতে দেদারছে বড় বড় ইমারত উঠছে। আশপাশের এলাকাগুলোতেও বহুতল ভবন উঠছে। অনেকেই সিসিক অনুমতি নিয়েছেন, আবার কেউ নেয়ার আবেদন করেই ভবন নির্মাণ শুরু করে দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা, পর্যটন অঞ্চলের অবকাঠামো স্থাপনাগুলো টেকসই, দৃষ্টিনন্দন ও পর্যটনবান্ধব নগরী গঠন করার লক্ষ্যে সিউক গঠন করা হয়। কিন্তু সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে যতটা জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার, সেটা সরকার কিংবা স্থানীয় জনগণ কারো পক্ষ থেকে রাখা হয়নি।

সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘সিউক কেবল আইনেই সীমাবদ্ধ বলে জেনেছি। প্রকৃত অর্থে এ কার্যক্রম শুরু হয়নি, জনবল নিয়োগ হয়নি। অফিস নেই। দ্রুত এর কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।’

সিসিকের একাধিকবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিলেটকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এক পা এগোলে অনেকখানি পিছিয়ে আসা হয় এ প্রকল্প বাস্তবায়নে। এখানে সরকারের আন্তরিকতার অভাব ছিল বলে আমি মনে করি। সিউক কাগজে-কলমেই আছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের কতটা আগ্রহ রয়েছে, সে ব্যাপারে আমার জানা নেই।’

নগর বিশেষজ্ঞ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোশতাক আহমদ দাবি করেন, একটি নগরে একাধিক সংস্থা থাকতে পারে। তবে সবগুলো সংস্থার সমন্বয় না থাকলে নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন হবে না। ঠেকসই উন্নয়ন করতে হলে এক দপ্তরের সঙ্গে অন্য দপ্তরে সমন্বয় সাধন করতে হবে। এর পরই এর সুফল পাওয়া যাবে। সিউক আইন হয়েছে বলে শুনেছি, তবে কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।

বিভাগীয় গণপূর্ত অফিস সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী (স্টাফ অফিসার) মো. আবু জাফর জানান, এখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ আলাদা প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব জনবল দিয়ে চলে। সিউকের কোনো অফিস হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ‘সিউক নিয়ে আপডেট কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই। আমরা চাই, নাগরিক সেবা প্রতিটি নাগরিকের হাতের নাগালে থাকুক।’ সিউকের পাশাপাশি ওয়াশার কার্যক্রম চালু করা জরুরি বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা হলে তিনি ফোন ধরেননি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদারও ফোন রিসিভ করেননি।

আরও