বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত, মামলা ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড এবং পুঁজিবাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মে জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে সাবেক ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অনিয়ম দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নাফিজ সরাফাত এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করে। একাধিক মামলা, সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত তিনি কোনো মামলায় দণ্ডিত হননি। বরং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আবারো দেশের আর্থিক খাতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ২০০৮ সালে বিএসইসির কাছ থেকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেস ম্যানেজমেন্ট পিসিএলের (বর্তমানে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট) লাইসেন্স নেন। তার সহযোগী ছিলেন ড. হাসান তাহের ইমাম। ওই সময়ই আর্থিক খাতে নাফিজের উত্থান শুরু হয়। ২০১৩ সালের মধ্যেই রেস ১০টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে রয়েছে ১৩টি ফান্ড।
বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) শেয়ার কেনা হয়। এর মাধ্যমে নাফিজ সরাফাত ও ড. হাসান তাহের ইমাম ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে স্থান করে নেন। নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আনজুমান আরা সাহিদও ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক ছিলেন। তবে এ বিনিয়োগ থেকে সংশ্লিষ্ট মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সুবিধা হয়নি।
ফারমার্স ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর পদত্যাগ করলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হন নাফিজ সরাফাত। পরে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক। আর্থিক সংকটে পড়া ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এবং রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক—মিলিয়ে ৭১৫ কোটি টাকার মূলধন সরবরাহ করা হয়।
এছাড়া পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন ও বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তাসহ ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে কোনো উদ্যোগই প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বরং গত আট বছরে ব্যাংকটি প্রায় ৬ হাজার ৯৯ কোটি টাকা নিট লোকসান করে। বর্তমানে সরকারি ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার আমানত ব্যাংকটিতে আটকে রয়েছে। এ অবস্থার মধ্যেই ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন নাফিজ সরাফাত।
রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টে নাফিজ সরাফাতের ২৫ শতাংশ ও ড. হাসান তাহের ইমামের ৭৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তবে কয়েক বছর ধরে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল, যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০২৪ সালে রেস পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বিএসইসি তদন্ত শুরু করলেও আইনি জটিলতায় তা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুনর্গঠিত বিএসইসিও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। গত দেড় দশকে পুঁজিবাজারে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও সে তালিকায় নাফিজ সরাফাত বা রেসের নাম নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেস্ট হোল্ডিংস ইস্যুতে কমিশনের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ড. হাসান তাহের ইমামকে শুনানিতে তলব করেছিল। তবে তারা উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নেন এবং সে কারণেই শুনানিতে উপস্থিত হননি। সম্প্রতি আপিল বিভাগ সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে কমিশনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আবারো শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুনানি শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাসহ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আর্থিক খাতে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন নাফিজ সরাফাত। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি একের পর এক ব্যবসায়িক ও আর্থিক সুবিধা অর্জন করেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ‘ফুফু’ বলে সম্বোধন করতেন। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে পরিচয় দিতেন ‘কাজিন’ হিসেবে। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
পতিত আওয়ামী সরকারের বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ তৎকালীন অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। এসব সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন আর্থিক সিদ্ধান্তে তিনি সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আ হ ম মুস্তফা কামালের সমর্থন নিয়ে বেস্ট হোল্ডিংসকে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন নাফিজ সরাফাত। যদিও সে উদ্যোগ সফল হয়নি। পরে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের দায়িত্বকালে প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজার থেকে ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত নাফিজ সরাফাত ও তার পরিবারের সদস্যদের ৭৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এছাড়া পদ্মা ব্যাংক থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা ঋণ আত্মসাতের চেষ্টা এবং ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজউকের বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে ৭১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলাও রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে নাফিজ সরাফাত ও তার পরিবারের নামে-বেনামে পরিচালিত ৫২টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে তিনি যাতে সম্পদ হস্তান্তর বা বেহাত করতে না পারেন, সেজন্য আদালতের আদেশে স্ত্রী-সন্তানসহ তার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে গুলশানে একটি ২০ তলা ভবন, ঢাকা ও গাজীপুরে ১৮টি ফ্ল্যাট, পূর্বাচলের প্লট ও জমি এবং দুবাইয়ে থাকা একটি ফ্ল্যাট ও ভিলা ক্রোকের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় তার বিরুদ্ধে বিচারিক শাস্তি হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুদক তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়। তবে শাস্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।’
নাফিজ সরাফাতের আর্থিক অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিও। ২০২৪ সালের শুরুতে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. হাসান তাহের ইমামের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। মাল্টি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মাধ্যমে বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই বছরের জুনে আদালতে ৮৫ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সিআইডির তৎকালীন অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জুয়েল চাকমা (বর্তমানে চাকরিচ্যুত)।
২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাফিজ সরাফাত, তার পরিবারের সদস্য এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন করে অর্থ পাচারের অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী, ছেলে ও সহযোগী ড. হাসান তাহের ইমামের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করা হয়।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, জালিয়াতি, ভুয়া ব্যাংক ও বিও হিসাব ব্যবহার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ অপব্যবহারের মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান নাফিজ সরাফাত। ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিএসইসির কাছ থেকে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের লাইসেন্স নেয়ার পরই তার প্রভাব বাড়তে শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন ড. হাসান তাহের ইমাম। পরবর্তী সময়ে মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে নাফিজের বিরুদ্ধে। শুরুতে আড়ালে থাকলেও ২০১৭ সালের পর ধীরে ধীরে সেগুলো প্রকাশ্যে আসে।
সিআইডির একাধিক কর্মকর্তার দাবি, ২০২৪ সালের শুরুতে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট-সংক্রান্ত তদন্তের সময় নাফিজ সরাফাত নিজের দায় ড. হাসান তাহের ইমামের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এজন্য সিআইডির তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ আলী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা জুয়েল চাকমার সঙ্গে বড় ধরনের অর্থিক লেনদেনও হয় তার। এর ভিত্তিতে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে দায়মুক্তি দিয়ে এবং ড. হাসান তাহের ইমামকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দেয়া হয়। পরে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত হন তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা জুয়েল চাকমা ও সিআইডির সে সময়ের প্রধান মোহাম্মদ আলী। পরবর্তী সময়ে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট নতুন করে নাফিজ সরাফাতের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। এ দফায় তার ও পরিবারের সদস্যদের অর্থ পাচারের প্রমাণ মেলে। এর ভিত্তিতে পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনুসন্ধানে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা সাহিদ, ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরী ও সহযোগী ড. হাসান তাহের ইমামের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।’
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন নাফিজ সরাফাত। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ, বড় ঋণ অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে তার অনানুষ্ঠানিক প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, দুদকের তদন্তকে ব্যবহার করে সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক দুই চেয়ারম্যান এমএ কাশেম ও আজিম উদ্দিন আহমেদকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। একই সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে স্ত্রী আঞ্জুমান আরা সাহিদকে পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন নাফিজ সরাফাত। এছাড়া ছেলে রাহিব সরাফাতকেও পরিচালক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকায় তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতীতে পদ্মা ব্যাংককে পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি। ব্যাংক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—এমন যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর।’
রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে নাফিজ সরাফাতের মালিকানাধীন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশকে প্লট বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়েই এ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদও সম্পৃক্ত ছিলেন।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনের ভিআইপি ক্যাফেটেরিয়ায় মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের আইন বিভাগের ২৯ শিক্ষার্থী। এ সময় আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও ছিলেন। বর্তমানে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন নাফিজ সরাফাতের ভাই চৌধুরী জাফরউল্লাহ সরাফাত। তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত ও বিতর্কিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওই আয়োজনে অংশ নেয়ার বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে ব্যাংক, পুঁজিবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ড-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় তার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ, সম্পদ জব্দ ও বিদেশযাত্রায় বিধিনিষেধের মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি এবং তিনি কোনো মামলায় দণ্ডিতও হননি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতের প্রশাসনিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কের একটি অংশ এখনো সক্রিয় থাকায় নাফিজ সরাফাতের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য, বিপুল আর্থিক সক্ষমতা, আইনি লড়াই এবং বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি এখনো নিজেকে আইনি ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী কয়েকটি গোষ্ঠীর মাধ্যমেও তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। নাফিজ সরাফাতের সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে একসময় চাকরি করেছেন এমন এক ব্যক্তি যিনি বর্তমান সরকারে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্বে রয়েছেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তিনিও তাকে সহায়তা করছেন বলে জানা গেছে। তাছাড়া সরকারদলীয় একাধিক রাজনীতিবিদের মাধ্যমেও বর্তমানে নাফিজ সরাফাত আর্থিক খাতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় রয়েছেন। ঋণ পুনর্গঠন, লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে গড়ে তোলার উদ্যোগে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন নাফিজ সরাফাত।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশে ব্যবহৃত তার মোবাইল নম্বরটি হোয়াটসঅ্যাপে সচল থাকলেও সেখানে তিনি সাড়া দেননি।