জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করে গত মে মাসে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কাজ বন্ধ রেখে শুরু করেন কলমবিরতি। চরমভাবে ব্যাহত হয় দেশের আমদানি কার্যক্রম। লাগাতার এ আন্দোলনে পিছু হটে সরকার। আলোচনার মাধ্যমে অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের আশ্বাসে স্থগিত হয় আন্দোলন। কিন্তু ঈদুল আজহার ছুটির পর এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ইস্যুতে ফের মাঠে নেমেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজস্ব আহরণের কাজে নিয়োজিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থাটির কর্মীদের আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থার শঙ্কা।
দেশের অর্থনীতি এমনিতেই মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় ধার নিয়ে ব্যয় মেটাতে হচ্ছে সরকারকে। তার ওপর এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রভাবে বন্দর ও কাস্টমসে আমদানি-রফতানি বিঘ্নিত হওয়ায় উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে তারা পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান চান।
সরকারকে দ্রুত সংকট সমাধানের তাগিদ দিয়ে বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলীহুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিল্পের কাঁচামালের একটি নিরবচ্ছিন্ন আমদানি চেইন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাস্টমস কার্যক্রম বন্ধ থাকলে নতুনভাবে শুল্কায়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে সময়মতো চালান খালাস করা সম্ভব হবে না, এতে খরচ বাড়বে এবং বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। এ পরিস্থিতি এড়াতে আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই দ্রুত এ সংকটের সমাধান নিশ্চিত করার, যেন উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়া না হয়।’
এনবিআর পৃথক্করণের জন্য গত ১৩ মে অধ্যাদেশ জারির পরদিন থেকে ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’-এর ডাকে এনবিআর ভবনে আংশিক কলমবিরতি পালন করা হয়। এরপর থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে এ কর্মসূচি চালিয়ে যান। এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ বাতিল ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানকে অপসারণসহ চার দাবিতে ২১ মে থেকে লাগাতার অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৫ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিসিএস (কাস্টমস ও এক্সাইজ) ও বিসিএস (কর) ক্যাডারের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে পৃথক্করণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি জারি করা অধ্যাদেশে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার কথা বলা হয়। এ ঘোষণার পর সেদিনই এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে কাজ না করার লাগাতার অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয় ওই সময়। ফলে ঈদুল আজহার ছুটির পর আবারো আন্দোলনের কারণে এনবিআর অস্থির হয়ে ওঠে।
এদিকে সরকার ঘোষিত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে অধ্যাদেশে সংশোধনের কাজ এগিয়ে নিতে ১৯ জুন ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এনবিআর। তবে সে কমিটিতে আন্দোলনরত ঐক্য পরিষদের কাউকে না রাখায় ২৩ জুন থেকে আবারো কলমবিরতির ঘোষণা আসে। সেই সঙ্গে ঘোষণা দেয়া হয়, ২৭ জুনের মধ্যে সংস্থাটির চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা না হলে আগামী শনিবার থেকে কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে ‘লাগাতার কমপ্লিট শাটডাউন’ চলবে। একই দিন পালন করা হবে মার্চ টু এনবিআর কর্মসূচিও। পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল এনবিআর ভবনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে অচলাবস্থা নিরসনে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চেয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।
আন্দোলনের কারণে প্রভাব পড়েছে বন্দরের কার্যক্রমে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কলমবিরতি পালন করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় শুল্কায়ন কার্যক্রম হয়েছে ১০ শতাংশের মতো। তবে কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এরই মধ্যে রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলোয় কাঁচামাল ছাড় করতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হতে শুরু করেছে বলে তারা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রামভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যালবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে শুল্কায়ন কার্যক্রম বন্ধ রাখলেই এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়। আর শুল্কায়ন কার্যক্রমে কমপ্লিট শাটডাউনের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে এটা ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন বড় ক্ষত তৈরি করবে আবার ভোক্তাদের নিত্য ও জরুরি পণ্যও সরবরাহ পাওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।’
আমদানি বন্ধের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতিকেও এর খেসারত দিতে হবে বলে মনে করছেন প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এমনিতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় রীতিমতো যুদ্ধ করছেন দেশের উদ্যোক্তারা। এমন সময় রাজস্ব কর্মকর্তারা যদি কমপ্লিট শাটডাউনের মতো কর্মসূচিতে যান সেটি আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা চাই একটা দ্রুত, বাস্তবসম্মত সমাধান হোক, যাতে শিল্প-কারখানাগুলোর সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে দ্রুত সমাধান করা হোক। একটা দেশে কিছুদিন পর পর এভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়াটা কারো জন্য সুখকর নয়।’
এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও সংস্থাটির ১৬ জন সদস্যের বৈঠক হয়। তবে কর ও কাস্টমস ক্যাডারের ‘একটি প্রতিনিধি দলকে’ আলোচনার জন্য আহ্বান জানানো হলেও তাদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠক শেষে অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সুখবর দিতে পারব। আশা করি, একটা সমাধান হবে।’
বৈঠকে উপস্থিত এনবিআরের একজন সদস্য যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলোচনায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়নি। উপদেষ্টা সবাইকে অনুরোধ করেন, ঐক্য পরিষদ যেন আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে সরকার আলোচনা করবে। অন্যথায় সরকার হার্ডলাইনে যাবে। চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হবে না।’
বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) না এলেও সব সিনিয়র কর্মকর্তা ও কমিশনাররা এসেছেন। তারা সবাই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। যারা আন্দোলন করছেন, বেশির ভাগই তাদের অধীনে কাজ করেন। তাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ করেছি এবং এ সমস্যার সমাধান তাড়াতাড়ি হবে। আগামী সপ্তাহে আরো একটি সভা করব। তখন একটা চূড়ান্ত সমাধান হবে।’
আগামী শনিবার থেকে এনবিআর কর্মীদের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘সেটার ব্যাপারে তাদের অনুরোধ করেছি। তারা যেন শিগগির এটা প্রত্যাহার করেন। এখানে আমাদের কারও ব্যক্তিগত ব্যাপার নেই। দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে তারা এটা শুনবেন বলে আশা করছি। কিছুদিনের মধ্যে দেখবেন সমাধান করে দেব।’
এনবিআর সংস্কারের আলাপ ও উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। নীতি ও প্রশাসনকে আলাদা করতে ২০০৮ সালে একটি আদেশ হয়েছিল। বলা হয়েছিল নীতিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে (আইআরডি) বসবেন। তখন জায়গা না থাকায় সেখানে আর যাওয়া হয়নি। তার আগে ২০০৪ সাল থেকেই এনবিআরের নীতি ও প্রশাসনকে পৃথকের প্রস্তাব করে আসছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। তারও আগে ১৯৭৯ সালে ট্যাক্সেশন এনকোয়ারি কমিশনের প্রতিবেদনে এনবিআরকে বিশেষ বিভাগের মর্যাদা দিতে বলা হয়। এছাড়া ভারতের মতো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বোর্ড নামে এনবিআরকে আলাদা করতে বলা হয়। কিন্তু সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।
প্রশাসনিক কোনো সংস্কারও হয়নি এনবিআরের। শুধু আইআরডি গঠন করা হয়। সব মিলিয়ে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সংস্কার আলাপ জোরালো হয়। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর এনবিআর সংস্কারে পাঁচ সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করে সরকার। ২২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেয়। এর মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল এনবিআর পৃথকের একটি খসড়া অধ্যাদেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে পরামর্শক কমিটির সুপারিশের সঙ্গে মিল না থাকায় রাজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিবাদ জানানো শুরু করেন।
দেশকে জিম্মি করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক তপন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এত লম্বা সময় ধরে এনবিআর ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে নিয়ে যা চলছে তা অবিশ্বাস্য। বন্দরে সব কাজকর্ম বন্ধ। যার ফলে বাণিজ্যের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে এনবিআর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখন যা চলছে তা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে স্থবিরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দেশকে জিম্মি করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ মুহূর্তে পুরো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা ব্যবসায়ীরা খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ পরিস্থিতিতে খুব কষ্ট করে ব্যবসার কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। আমাদের গ্রুপের ব্যবসায় শুধু স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক না। আমদানি-রফতানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও রয়েছে আমাদের। আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বন্দরের সব কাজকর্ম বিঘ্নিত হওয়ায় চালান ছাড় করা যাচ্ছে না। এটা তো হতে পারে না। অনেকে শিপমেন্ট করতে পারছে না, রফতানি হচ্ছে না। সব আটকে রয়েছে। আমরা আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি ঠিক করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে বিদ্যমান অচলাবস্থা নিরসনের প্রয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতেও রাজি আছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনবিআরের যারা আন্দোলনে রয়েছেন, তাদের কোনো যৌক্তিক দাবি থাকলে মেনে নেয়া উচিত। সংস্কার যা হয়েছে সেটা নিয়ে যদি কারো কোনো আপত্তি থাকে এবং সেটি যদি যৌক্তিক হয়, সেটাকে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সংস্কার কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। আর আন্দোলন করে এভাবে দেশকে অচল করে দেয়াটাও কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।’
এনবিআরের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ চাওয়ার বিষয়ে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘এ দাবি কেন চাওয়া হচ্ছে তা পরিষ্কার না। শুরু থেকে তাকে ইতিবাচকভাবেই কাজ করতে দেখেছি। বিগত দিনে আমরা দেখেছি খাতসংশ্লিষ্টদের কথা শোনা হতো না, ফলে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো এনবিআরের ঊর্ধ্বতনরা আমলে নিতেন না। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যানকে এমনটা দেখিনি। যারা আন্দোলন করছেন তাদের সঙ্গে বর্তমান এনবিআরের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, উভয়পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এখানে প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতার ভূমিকায় আসতে হবে।’
রফতানি ব্যাহত হলে শ্রমিকদের বেতন দেয়া সম্ভব হবে না এবং এ কারণে শ্রমিকরা রাস্তায় নামলে পরিস্থিতি আরো বিরূপ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুনে এরই মধ্যে ১০ দিনের ছুটি পালন করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রফতানিকারক কারখানাগুলোর উৎপাদন জুনে কম হয়েছে। এখন যদি আবার আন্দোলনের কারণে আমদানি-রফতানি ব্যাহত হয় তাহলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ বাধাগ্রস্ত হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা কাজ শুরু করেছেন। উভয়পক্ষের মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে যদি কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব হয় আমরা তা করব। পোশাক রফতানিকারকরা এরই মধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বন্দর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন বন্দরে রফতানি কার্যক্রম সচল থাকলেও আমদানি বন্ধ। আমদানি বন্ধ থাকায় কাঁচামাল সময়মতো না এলে রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। রফতানি যদি ব্যাহত হয় তাহলে বেতন দেয়া সম্ভব হবে না। এতে করে শ্রমিকরা যদি রাস্তায় নামে তাহলে পরিস্থিতিকে আরো বিরূপ করে তুলতে পারে।’
এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ আন্দোলনের কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সরকারের বাজেট ঘাটতি আরো বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে সরকারকে আরো বেশি অর্থ ধার করতে হবে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরে রাজস্ব আহরণের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে বের হতে না পেরে মাঝপথে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে গত ২৫ জুন পর্যন্ত এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে এনবিআর মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে। সেই হিসাবে চলতি মাসে এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার রাজস্ব।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামে (ইআরএফ) গতকাল এক সেমিনারে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এ আন্দোলনের ফলে রাজস্ব আদায়ে ‘কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশেষ করে, (রেভিনিউ) কিছুটা তো হ্যাম্পার হচ্ছেই, আমাদের যে অনগোইং মুভমেন্ট যেটা হচ্ছে সেটার কারণে। তো আপনারা, আমরা—সবাই দেশের জন্য কাজ করব। আমাদের মূলত দেশের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা উচিত। যেকোনো সংস্কার করি, যেকোনো আইন করি—যা কিছু করি, ইভেন আন্দোলন করি, সংগ্রাম করি প্রত্যেকটাই আমাদের নিজেদের জন্য না হয়ে যেন দেশের জন্য হয়।’
আন্দোলনকারীরা মূলত সংস্কার ও এনবিআর পৃথক চান না। আবার এ কথা বলতেও পারছেন না। সেজন্য তারা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন বলে মনে করেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজস্ব নীতি সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। এনবিআর পৃথক্করণ ইস্যুতে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে চাকরিজীবীরা তার ঊর্ধ্বতনের অপসারণ চাইতে পারেন না। এভাবে অচলাবস্থা তৈরি করা রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ। তারা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন, শক্তি প্রদর্শন করতে পারেন না।’
এনবিআরের সাবেক এ চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘এস আলমের মতো অলিগার্ক অনেক ব্যবসায়ী গ্রুপকে এনবিআরের কর্মকর্তারা করফাঁকিসহ নানা অনিয়মের প্রশ্রয় দিয়েছেন। এনবিআরের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট এনবিআরেরই বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি উদ্ঘাটন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও শুরু হয়েছিল। আরো তালিকা তৈরি আছে। সেটা থামাতে তারা আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে। মার্চ টু এনবিআর কর্মসূচি করে কীভাবে? তারা তো এনবিআরেরই লোক! আন্দোলন করে যদি চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা যায়, পছন্দের চেয়ারম্যান বসানো যায়, তাহলে তো মানুষ কর দেবে না। অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময়ে সংস্কার করা যায়নি। এবার আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।’
বিদ্যমান কাঠামোতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব নয় বলেই এনবিআরকে পৃথক্করণের কথা বলা হচ্ছে বলে জানান বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এটি নতুন কিছু নয় বরং দুই দশক ধরেই আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই আমাদের এ রাজস্ব কাঠামো চলে আসছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য নিজেই সে ব্যবস্থা থেকে অনেক আগে বেরিয়ে এসেছে। সেখানে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করে ট্রেজারি বিভাগ। আর এইচএমআরসি নামে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান রাজস্ব আদায়ের কাজ করে। পাকিস্তানও বেশ আগেই এ পৃথক্করণ করেছে। ভারতও এক্ষেত্রে অনেক সংস্কার করেছে। বাংলাদেশে গত মে মাসে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে পৃথক্করণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ।’
একটি স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো থাকা প্রয়োজন যাতে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তরফ থেকে দুটি অভিযোগ ছিল যে পৃথক্করণের বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি এবং সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। সরকারের দিক থেকে তাদের এ আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে আগামী জুলাই পর্যন্ত অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় পৃথক্করণ অধ্যাদেশটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সেটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ তো রয়েছে। আলোচনার সময় এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারতেন। দেশ ও অর্থনীতিকে জিম্মি না করে এক্ষেত্রে আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তো এক ধরনের অচলাবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে।’