সালমান-এস আলমের নিলাম সম্পদের ক্রেতা নেই

এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে খেলাপি ঋণের (বিনিয়োগ) টাকা আদায়ে এখন পর্যন্ত ৩৫টি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এসব নিলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে খেলাপি ঋণের (বিনিয়োগ) টাকা আদায়ে এখন পর্যন্ত ৩৫টি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এসব নিলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল একটি নিলামে একজন ক্রেতা অংশ নিয়েছেন। বাকি ৩৪টি নিলামে কোনো ক্রেতা অংশ নেননি বলে জানা গেছে। অর্থাৎ জামানতের সম্পত্তি বিক্রি করে এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

দেশের বৃহত্তম এ ব্যাংকটির মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। বেনামি বিভিন্ন কোম্পানির নামে এ ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। খেলাপি হয়ে যাওয়া এ ঋণ আদায়ে এরই মধ্যে ১৯টি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ব্যাংকটি। কিন্তু কোনো নিলামেই জামানতের সম্পত্তি কেনার মতো ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের। এরই মধ্যে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ আদায়ে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ব্যাংকটি। কিন্তু অন্য ব্যাংকের মতো এ ব্যাংকটিতেও জামানত থাকা এস আলমের কোনো সম্পত্তির ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ এবং সাইফুল আলম মাসুদের মালিকানাধীন এস আলম গ্রুপের ঋণ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো। বাকি ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। তবে এ ঋণের বড় অংশ নেয়া হয়েছে বেনামি বিভিন্ন কোম্পানির নামে। যেসব কোম্পানির মালিক হিসেবে আছেন গৃহকর্মী, পিয়ন, ড্রাইভার, চটপটির দোকানদারের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আর ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রয়েছে এমন অনেক সম্পদের হদিসও মিলছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কেবল সালমান এফ রহমান কিংবা এস আলম গ্রুপের ঋণের ক্ষেত্রেই নয়, বরং দেশের ব্যাংকগুলো থেকে বিতরণকৃত বেশির ভাগ বড় ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতের সম্পত্তি বিক্রি করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের মালিকানাধীন সিকদার গ্রুপ, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আসলামুল হকের মাইশা গ্রুপ, হলমার্ক গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, এননটেক্স, নাসার মতো গ্রুপগুলো রয়েছে। ২০০৯-পরবর্তী দেড় দশকে এসব গ্রুপ দেশের ব্যাংক খাত থেকে লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছে। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে রাখা হয়েছিল নামমাত্র জামানত। কিছু ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বড় ভবন কিংবা মূল্যবান জমি থাকলেও সেগুলোর এখন ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যচ্ছে না। ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের আমলের প্রভাবশালী বা মাফিয়া হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি কিনে ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার শঙ্কা থেকেও অনেকে নিলামে অংশ নিচ্ছে না বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ে নিলাম ডাকার মতো বন্ধকি সম্পত্তি খুঁজে পাচ্ছে না দেশে এমন ব্যাংকও রয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর একটি শরিয়াহ্ভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ নিজেই গত দেড় দশক এ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকটির পর্ষদে থাকা বাকি সদস্যরাও ছিলেন তার পরিবারের সদস্য। অনেকটা পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়া এ ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের (বিনিয়োগ) পরিমাণ প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। এ ঋণের ৯৫ শতাংশ এখন খেলাপি। এ খেলাপি ঋণ আদায়ে জামানতের সম্পত্তি বিক্রির উপায়ও নেই ব্যাংকটির হাতে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছর এ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানকে, যিনি একসময় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঋণ আদায় পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা খেলাপি ঋণ আদায়ে নিলাম পর্যন্ত যেতেই পারছি না। কারণ এ ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে তেমন কোনো জামানত রাখা হয়নি। এস আলম নিজেই এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে থাকায় তার নিজের কোম্পানির নামে কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি। এজন্য বেনামি ও ভুয়া কোম্পানির নামে ঋণ দেয়া হয়েছে। গৃহকর্মী, পিয়ন, দারোয়ানের নামেও কোম্পানি খুলে এ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। এ ব্যাংকের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অডিটে উঠে এসেছে। সিকদার গ্রুপ, মাইশা গ্রুপের মতো কোম্পানিকে যে ঋণ দেয়া হয়েছে, সেগুলোর বিপরীতেও তেমন কোনো জামানত নেই।’

প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাংকের ১৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৫ শতাংশ এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট। এসব ঋণের বিপরীতে তেমন কোনো জামানত নেই। খেলাপি ঋণ আদায়ে গত কয়েক মাসে আমরা কিছু নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু সেসব নিলামে জামানতের সম্পত্তি কেনার জন্য কেউ অংশ নেয়নি।’

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত শরিয়াহ্ভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূতকরণের এ প্রক্রিয়ায় থাকা অন্য ব্যাংক তিনটি হলো সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক পিএলসি। এর মধ্যে প্রথম চারটি ব্যাংকেরই নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। আর এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার।

দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এস আলম গ্রুপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যায় ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি। এরপর ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে বিভিন্ন কোম্পানির নামে ঋণ (বিনিয়োগ) বের করে নেয় গ্রুপটি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকটিতে বিশেষ নিরীক্ষাও চালানো হয়। নিরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক থেকে বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট। কিছু ঋণের সুবিধাভোগী অন্যরা হলেও ৭০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি এস আলম গ্রুপ নিয়েছে। এ ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে ৪৪টি মামলা দায়ের করেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের আওতায় ৪০০-এর বেশি চেক জালিয়াতির মামলাও দায়ের করেছে। গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গ্রুপটির বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির জন্য ৩৫টি নিলাম আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু একটি নিলামে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ‘এস আলম রিফাইন সুগার ইন্ডাস্ট্রি’র একটি ভবন ছাড়া কোনো সম্পত্তিই বিক্রি হয়নি। ৩৪টি নিলামে কোনো ক্রেতাই অংশ নেয়নি বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

ইসলামী ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এস আলম গ্রুপসংশ্লিষ্ট ৬৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে যে সম্পত্তি জামানত আছে, সেগুলোর মূল্যমান ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তবে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর গ্রুপটির আরো ৯ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি অ্যাটার্চ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের ৬ হাজার কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার রয়েছে। সব মিলিয়ে গ্রুপটির কাছ থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এস আলম গ্রুপের কাছে ইসলামী ব্যাংকের ৭০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ (ঋণ) রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গ্রুপটির কাছ থেকে ঋণ আদায়ে আমরা ৩৫টি নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। কিন্তু ৩৪টি নিলামে কেউ অংশ নেয়নি। এ কারণে জামানতের সম্পত্তি বিক্রি সম্ভব হয়নি। তাই আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশিত নীতিমালা মেনে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছি। আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী অ্যাসেট রিকভারি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। এস আলম গ্রুপ ছাড়াও অন্য ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এস আলম গ্রুপ সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে জনতা ব্যাংক থেকে। একসময় সরকারি খাতের সেরা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এ ব্যাংকটি এখন সবচেয়ে পর্যুদস্ত। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ খেলাপিযোগ্য বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে কেবল সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির নামে গেছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ৫৫০ কোটি ছাড়া পুরো ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটি থেকে এস আলম গ্রুপের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকায়। এ ঋণের পুরোটাই এখন খেলাপি।

বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিলের চেষ্টা করলেও এস আলম গ্রুপের ঋণের বিপরীতে জামানতের সম্পত্তি নিলামে তুলেছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এস আলম গ্রুপের বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির জন্য আমরা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু কোনো ক্রেতাই নিলামে অংশ নেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিলের চেষ্টা চলছে। এর আগে এননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণের বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব সম্পত্তি কেনার জন্যও কোনো ক্রেতা আসেনি। অতীতে কোনো বাছবিচার ছাড়াই এ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এখন এ ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়ে বিপদেই আছি।’

সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন সালমান এফ রহমান। তার ছেলে সায়ান ফজলুর রহমান ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। আইন অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কোম্পানির জন্য ঋণ নিতে পারেন না। নিলেও সে ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হয়। যদিও সালমান এফ রহমান এ নীতির ধার ধারেননি। বেনামি বিভিন্ন কোম্পানির নামে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে জামানতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। খেলাপি হয়ে যাওয়া এসব ঋণ আদায়ে এরই মধ্যে ১৯টি নিলামের আয়োজন করেছে ব্যাংকটি। যদিও নিলামে কোনো ক্রেতাই অংশ নেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার মো. মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। গতকাল বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শন করে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ খুঁজে পেয়েছে। এসব ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় আমরা বন্ধকি সম্পত্তির নিলাম আহ্বান করেছিলাম। কিন্তু কোনো ক্রেতাই নিলামে অংশ নেয়নি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে আমরা ২৩টি মামলা দায়ের করেছি।’

সালমান এফ রহমানের জামানতের সম্পত্তির ক্রেতা পাওয়া না গেলেও অন্য কয়েকটি কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রির বিষয়ে দরকষাকষি চলছে বলে জানান মেহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘তিন-চারজন বড় খেলাপি গ্রাহকের সম্পত্তি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছে। সমঝোতার ভিত্তিতে এসব সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে অগ্রগতি হবে। সালমান এফ রহমান ছাড়াও সিকদার ও নাসার মতো প্রভাবশালী কিছু গ্রাহকের ঋণ এ ব্যাংকে রয়েছে। সেসব ঋণ আদায়েও আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের কোনো ঋণ নেই। তবে এ দুটি ব্যাংকে বড় অংকের ঋণ রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের। গত এক বছরে এ দুটি ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপ কিছু অর্থ পরিশোধ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানি গত এক বছরে ১৫০ কোটি টাকার মতো পরিশোধ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী আমরা গ্রুপটির ঋণ পুনঃতফসিল করে দিচ্ছি। এ ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। কিছু গ্রাহক ঋণ পুনঃতফসিলে এগিয়ে আসছেন। বাকিদের বিরুদ্ধে আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ আছে সোনালী ব্যাংকের। অতীতে এ ব্যাংকটি একাধিকবার ঋণ আদায়ে বেক্সিমকোর বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তুলেছিল। কিন্তু কোনোবারই নিলাম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে কিছু নিলাম স্থগিত হয়েছে। আবার কিছু নিলামে কোনো ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান জানান, ‘বেক্সিমকো গ্রুপ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করেছে। এ বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী এগোচ্ছি। অতীতে হলমার্কের সম্পত্তি বিক্রির জন্য একাধিকবার নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রেতা পাওয়া যায়নি। এবার আমরা ভাগ ভাগ করে গ্রুপটির সম্পত্তি নিলামে তুলছি। প্রাথমিকভাবে হলমার্কের মেশিনপত্র নিলামে তোলা হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩০টিরও বেশি ব্যাংকে এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ রয়েছে। গ্রুপ দুটিকে ঋণ দেয়া সব ব্যাংকই এখন বিপদে। এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণও অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

বেক্সিমকো গ্রুপকে ঋণ দিয়ে বিপদে পড়া ব্যাংকগুলোর একটি এবি ব্যাংক পিএলসি। প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার এখন ৬০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া এ দুটি গ্রুপকে বড় অংকের ঋণ দিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ৬০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ নিয়ে এ ব্যাংকটিও এখন অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে।

এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে বেশি মূল্যের কোনো সম্পত্তিই বেচাকেনা হচ্ছে না। আমরা বড় কিছু ঋণখেলাপির সম্পত্তি নিলামে তুলেছিলাম। কিন্তু কোনো ক্রেতা সেসব নিলামে অংশ নেননি। এ অবস্থায় বেক্সিমকো গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ আদায় করা অসম্ভব বিষয়। গ্রুপটির কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঋণ পুনঃতফসিলের কথা জানিয়েছেন।’

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হয়ে সালমান এফ রহমান কারাগারে রয়েছেন। আর সাইফুল আলম মাসুদ আছেন সিঙ্গাপুরে। তিনি সপরিবারে কয়েক বছর আগে দেশটির নাগরিকত্ব নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে চেষ্টা করেও গ্রুপ দুটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কারো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বেক্সিমকো গ্রুপের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গ্রুপটি সব ঋণ পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নিয়েছে। আর এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন জানিয়েছেন, ঋণ পরিশোধের সুযোগ চাইলেও তাদের দেয়া হয়নি। এজন্য তারা আন্তর্জাতিক আদালতে যাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, দেশের ব্যাংক খাতে গত দেড় বছরে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে। খেলাপি হওয়া এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল গত দেড় দশকে। ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকায় ঠেকে। আর চলতি বছরের জুনে এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। সে হিসাবে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশই এখন খেলাপি।

আরও