মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। প্রায় পাঁচ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন যমুনা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও পদে। দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘ ৩৯ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এ ব্যাংকার সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমামূল হাছান আদনান
যমুনা ব্যাংক কেমন চলছে?
প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও যমুনা ব্যাংক বেশ ভালোভাবে এগিয়ে চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সেবার মানে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। গ্রাহকদের প্রত্যাশা ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিত্যনতুন পণ্য ও সেবা নিয়ে এসেছি আমরা। কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম এবং গ্রাহকদের আস্থা আমাদের ব্যাংককে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের ব্যাংক খাতের বিরাজমান সংকট সত্ত্বেও যমুনা ব্যাংকের আমানত প্রবাহ বেড়েছে।
দেশের অর্থনীতিতে যমুনা ব্যাংকের অবদান কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
যমুনা ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০১ সালের ৩ জুন। সে হিসেবে ২৩ পেরিয়ে এ ব্যাংকের বয়স এখন ২৪ বছর চলছে। দীর্ঘ এ পথযাত্রায় দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে যমুনা ব্যাংক। আমাদের ব্যাংকের অর্থায়নে দেশে গড়ে উঠেছে হাজারো শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন খাতে এ ব্যাংকের ঋণ স্থিতি ছিল প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে আমরা সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডেও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের পাশাপাশি এসএমই, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। যমুনা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রফতানি হচ্ছে। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নেও যমুনা ব্যাংকের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো।
এখন পর্যন্ত যমুনা ব্যাংকের বিস্তৃতি কতটুকু ঘটল?
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যমুনা ব্যাংক প্রবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। আমরা চমকপ্রদ কোনো প্রবৃদ্ধি কিংবা উল্লম্ফনের পেছনে ছুটিনি। বরং আমাদের প্রতিটি কার্যক্রমই ছিল সুচিন্তিত ও টেকসই। বর্তমানে সারা দেশে ১৫০টির বেশি শাখার মাধ্যমে যমুনা ব্যাংক গ্রাহকদের আধুনিক ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এটিএম বুথ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মতো আধুনিক সেবা যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমাদের সেবার পরিসর আরো বিস্তৃত হয়েছে। যমুনা এখন সাড়ে ১৩ লাখ গ্রাহকের ব্যাংক।
দুই যুগের পথচলায় আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো কী?
যমুনা ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে অর্জন করেছে নানা পুরস্কার ও স্বীকৃতি। আমাদের ৩৬ বার সেরা প্রাইমারি ডিলার ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। চলতি বছর আমাদের ব্যাংক সর্বোচ্চ ইপিএস অর্জন করেছে। দেশের ব্যাংক খাতে আমরা সাসটেইনেবল রেটিংয়ে শীর্ষস্থান অধিকার করতে পেরেছি। ডাবল এ১ ক্রেডিট রেটিং পাওয়ার পাশাপাশি যমুনা ব্যাংক অন্যতম সেরা করদাতা ব্যাংক হিসেবেও পরিচিত।
এ মুহূর্তে দেশের এক ডজনের বেশি ব্যাংক তারল্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। এক্ষেত্রে যমুনার পরিস্থিতি কেমন?
আপনি ঠিকই বলেছেন। দেশের অনেক ব্যাংকেই তীব্র তারল্য সংকট চলছে। তবে যমুনা ব্যাংক এ সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্ত। আমাদের ব্যাংকে তারল্যের কোনো সংকট নেই। গ্রাহকদের দৃঢ় আস্থার কারণে আমাদের ব্যাংকের আমানত প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০২৩ সাল শেষে যমুনা ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত ছিল ২৪ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে আমানতের এ স্থিতি ২৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর আমানত আরো বেড়েছে। অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমরা স্থিতিশীলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছি। নিয়মিতভাবে তারল্য পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রাহণের মাধ্যমে আমরা এ অবস্থান নিশ্চিত করেছি। আমানতের পাশাপাশি চলতি বছর যমুনা ব্যাংকের মুনাফাসহ সব ক্ষেত্রেই ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
করপোরেট সুশাসনের অভাবের কারণে দেশের ব্যাংক খাত অনেক ক্ষেত্রে পথ হারিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যমুনা ব্যাংকের করপোরেট সুশাসনের অবস্থা কী?
যমুনা ব্যাংক করপোরেট সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী এবং সুসংহত ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছে। আমরা ব্যাংকের পরিচালনা পদ্ধতি, নীতি, কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম। এখন সেটিরই সুফল পাচ্ছি। এ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে করপোরেট সুশাসন নীতিমালা পর্যালোচনা করে। এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি দেখা গেলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমরা গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ব্যাংক পরিচালনায় আপনি কতটা স্বাধীনতা পাচ্ছেন?
ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমি ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় যথাযথ স্বাধীনতা উপভোগ করছি। তবে এ স্বাধীনতার সীমা ব্যাংকের নীতিমালা এবং পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশনার মধ্যে আবদ্ধ। আমি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা পেলেও সেই সিদ্ধান্তগুলো ব্যাংকের স্বার্থ এবং দায়িত্বের প্রতি সংগতিপূর্ণ হতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংককে সুসংহতভাবে পরিচালনা করা এবং গ্রাহকদের সর্বোত্তম সেবা দেয়া।
বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশ ব্যাংকের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করছে, যা ব্যাংক খাতের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যেতে পারে, যার ফলে ঋণের চাহিদা কমবে। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও স্থিতিশীলতায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যাংকগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।
অর্থনৈতিক বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর কী ধরনের প্রস্তুতি নেয়া উচিত?
বিরাজমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ব্যাংকগুলোকে তাদের ঋণ পোর্টফোলিওর গুণগত মান পর্যালোচনা করতে হবে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে তাদের কার্যক্রমকে সুসংহত করার জন্য কৌশল অবলম্বন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকসেবা উন্নত করতে এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির দিকে নজর দিতে হবে। ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেনের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বশেষে বলব, ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ মূলধন-রিজার্ভ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রস্তুতি ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির সহায়ক হবে।
দেশের ব্যাংক খাত সংস্কারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এসব পদক্ষেপের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ব্যাংক খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া উদ্যোগগুলো সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। এসব পদক্ষেপ আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করবে। যমুনা ব্যাংক এ পরিবর্তনগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। কারণ আমরা দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ে বিশ্বাসী। আমরা আশা করি, এসব সংস্কার আমাদের কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। গ্রাহকদের জন্যও আরো নিরাপদ ব্যাংকিং পরিবেশ নিশ্চিত করবে।