কিন্তু এটির পরিবর্তে খনন করা হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সংরক্ষিত সেচ খাল। অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্রকৌশল নকশা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে পুরো কাজ। অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের প্রকল্প হলেও অধিকাংশ মাটি কাটা হয়েছে এক্সক্যাভেটর দিয়ে। খননের সময় কেটে ফেলা হয়েছে খালপাড়ের অসংখ্য ফলদ ও বনজ গাছ। নিয়ম ভেঙে খালের ভেতরের পাড়েই রোপণ করা হয়েছে শত শত গাছের চারা। এতে প্রায় ১ হাজার ৬ হেক্টর কৃষিজমির সেচ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জানা গেছে, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় ডি-১২এক্সকে ড্রেনেজ খালের ৪ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার খননের জন্য ১ কোটি ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ২৯৮ টাকা এবং ১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খালের ১ দশমিক ৩১ কিলোমিটার খননের জন্য ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩৫০ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পের শর্ত ছিল উপকারভোগী শ্রমিক নিয়োগ, পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনে সহায়তা নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত ১-ডি-১১-এন ড্রেনেজ খালের কাজ না করে গত ১১-৩০ মে পর্যন্ত শিতলী ও পায়রাডাঙ্গা এলাকায় পাউবোর সংরক্ষিত টার্শিয়ারি সেচ খাল (টি-২এস ৪) প্রায় ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার খনন করা হয়। অথচ অনুমোদিত ড্রেনেজ খালের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, টারশিয়ারি সেচ খাল ইচ্ছামতো খনন করা যায় না। নির্ধারিত প্রকৌশল নকশা অনুসারে কেবল পুনঃআকৃতি করা যায়, সেটিও বোর্ডের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর কোনো নকশা বা কারিগরি মতামত নেয়নি। সমালোচনার মুখে কাজ শেষ হওয়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর গত ১৬ জুন পাউবো থেকে অনাপত্তিপত্র নেয়া হয়।
বোর্ডের কর্মকর্তারা আরো জানান, নিয়ম অনুযায়ী সেচ খালের তলদেশ থেকে মাত্র ছয় ইঞ্চি মাটি অপসারণ করে পাড়ে ফেলতে হয়, যাতে জমির তুলনায় খাল অতিরিক্ত গভীর না হয়ে পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি। কোথাও খাল অতিগভীর, কোথাও উঁচু-নিচু হয়ে গেছে। ফলে সেচের পানি পাশের জমিতে ওঠার পরিবর্তে খালের মধ্যেই আটকে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নিয়ম অনুযায়ী খালের বাইরের পাড়ে গাছ লাগানোর কথা থাকলেও এখানে শত শত গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে ভেতরের পাড়ে। পাউবোর ভাষ্য, এসব গাছ বড় হলে সেচের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। খননের সময় খালপাড়ের অসংখ্য ফলদ ও বনজ গাছ কেটে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য হলেও অধিকাংশ মাটি কাটা হয়েছে এক্সক্যাভেটর দিয়ে। শ্রমিকদের দিয়ে কেবল সামান্য অংশের মাটি সমান করা হয়েছে। কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এলে শ্রমিক উপস্থিত থাকলেও অন্য সময় চলেছে মেশিন।
শিতলী গ্রামের কৃষক বানাত আলী বলেন, ‘এভাবে খাল কাটলে মাঠে পানি পৌঁছবে না।’ ওহিদুল ইসলাম নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘জমির চেয়ে খাল বেশি গভীর হয়ে গেছে।’
কৃষক রফি উদ্দিন বলেন, ‘এটি খাল সংস্কার নয়, বরং কৃষকদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। সরকারের ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নে এমন অনিয়ম হওয়া উচিত নয়।’
খালপাড়ের কয়েকজন নারী জানান, খননের সময় ভেকু মেশিন দিয়ে অনেক গাছ উপড়ে ফেলা ও কেটে দেয়া হয়েছে। বাধা দিলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়।
পিআইসির দায়িত্বে থাকা কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মর্জিনা বেগমের স্বামী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। পিআইও স্যারই ভালো বলতে পারবেন।’ তবে শ্রমিক নিয়োগ বা মেশিন ব্যবহারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুর রহমানের দপ্তরে গেলে তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, ‘এ কাজ করতে হবে না আপনার। এ বিষয়ে আমি কিছু বলব না।’ এরপর তিনি কক্ষ ত্যাগ করেন।
ঝিনাইদহ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, ‘সেচ খালের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ডিজাইন অনুসরণ বাধ্যতামূলক। আমাদের কাছে কোনো ডিজাইন চাওয়া হয়নি। বিষয়টি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।’
জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, ‘খাল খনন নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তে কর্মসংস্থান প্রকল্প বাস্তবায়ন বা খননকাজে অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’