হিলিতে দ্রুত বাড়ছে বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়ামের বিস্তার

দিনাজপুরের হিলি রেলস্টেশন ও আশপাশ এলাকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়াম।

দ্রুত এর পরিধি বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ট্রেনযাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, বিষাক্ত এ উদ্ভিদ মানবদেহের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। রেললাইনের ধার ও স্টেশনের আশপাশে ঝাঁক বেঁধে ফুটে থাকা সাদা ফুল দেখে না জেনে অনেকেই এর সংস্পর্শে আসছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিষাক্ত এ আগাছা দ্রুত পরিষ্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

সরজমিনে দেখা গেছে, হিলি রেলস্টেশন এলাকা, স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়, সিগন্যাল পয়েন্ট ও রেললাইনের দুই পাশে এখন শোভা পাচ্ছে পার্থেনিয়ামের সাদা ফুল। দূর থেকে দেখতে সুন্দর মনে হলেও এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। জানা গেছে, প্রতিদিন শত শত যাত্রী এ স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেন। অসাবধানতাবশত অনেক যাত্রী ও পথচারী এ বিষাক্ত গাছের সংস্পর্শে আসছেন। এতে নিত্যদিন নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনছেন তারা।

চিকিৎসকদের মতে, পার্থেনিয়াম গাছ কেবল স্পর্শ করলেই ক্ষতি হয় না। এর রেণু বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এ গাছের সংস্পর্শে এলে ত্বকে লালচে দাগ পড়ে। সেই সঙ্গে চুলকানি, মারাত্মক একজিমা বা ডার্মাটাইটিস হতে পারে। পার্থেনিয়াম ফুলের রেণু বাতাসে ভেসে মানুষের শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে। এতে অ্যালার্জি, তীব্র হাঁপানি ও সাইনোসাইটিসের মতো জটিল সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এ গাছের কাছাকাছি থাকলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। শুধু মানুষই নয়, গবাদিপশু এ তৃণলতা খেলে তাদের লিভার ও পাকস্থলীর ক্ষতি হয়। এমনকি দুগ্ধবতী গাভির দুধ তেতো হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার জানান, হিলি রেলস্টেশন ও আশপাশ এলাকায় এসব বিষধর গাছ ছড়িয়ে পড়েছে। আগে তারা ছোটবেলায় এখানে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলতেন। এখন গাছগুলোর বিস্তারের কারণে মাঠে খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেছে। এ গাছগুলো গবাদিপশু ও মানুষের সমানে ক্ষতি করছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এসব গাছ ধ্বংস করে এলাকা পরিষ্কার রাখা।

রাহিম শেখ নামে অন্য বাসিন্দা বলেন, ‘‌এটি পার্থেনিয়াম নামক বিষাক্ত আগাছা, যা আমাদের ও পশুপাখির জন্য খুবই ক্ষতিকর। কর্তৃপক্ষের কাছে একটাই দাবি, তারা যেন পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে দ্রুত নজর দেন।’

স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম জানান, রাস্তার দুই পাশে সাদা ফুল ফুটে দেখতে সুন্দর লাগে। কিন্তু এগুলো বিষধর। মানুষের হাত-পায়ে লাগলে চুলকানি হয় ও বড় ঘা তৈরি হয়। এতে মানুষ বড় রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

হিলি রেলস্টেশন মাস্টার জয়ন্ত চক্রবর্তী জানান, আসলে এটি বিষাক্ত গাছ কিনা তা তার জানা ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমেই তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তবে পরিবেশ ঠিক রাখতে তারা প্রতিনিয়ত ওষুধ দিয়ে ঘাস মারেন। এখন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. হুমায়ন কবির বলেন, ‘পার্থেনিয়াম মূলত আমেরিকার একটি ক্ষতিকর আগাছা। এটি খুব দ্রুত গ্রো বা বংশবৃদ্ধি করে। গবাদিপশু দুর্ঘটনাবশত এ ঘাস খেলে মুখে ঘা হয়। দীর্ঘমেয়াদে খেলে কিডনি ড্যামেজ ও লিভারের ক্ষতি হয়। দুগ্ধবতী গাভি বা ছাগল খেলে দুধের স্বাদ বদলে যায়, এমনকি মাংসের স্বাদও পরিবর্তন হতে পারে। আর মানুষের ত্বকে লাগলে ডার্মাটাইটিস ও ইনফ্লামেশন হয়। বাতাসের মাধ্যমে রেণু ফুসফুসে গেলে অ্যাজমা বা হাইপারসেনসিটিভিটি রিঅ্যাকশন হয়। তাই গাছটি শনাক্ত করতে পারলে কখনই খালি হাতে ধরা যাবে না।’

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলস্টেশন এলাকায় এ আগাছার অস্তিত্ব দেখা গেছে। এটি নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবগত করা হয়েছে। গাছগুলো তুলে মাটিতে গর্ত করে পুতে ফেলা অথবা পুড়িয়ে ফেলা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এছাড়া খাবার লবণমিশ্রিত পানি স্প্রে করেও এটি নির্মূল করা যায়। তবে তুলে গর্ত করে পুঁতে ফেলাই সেরা উপায়। আশা করা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এটি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেবে।’

আরও