সেজন্য তারা একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে পার্কিং সুবিধাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকা মহানগরীতে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার পাশে যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং করার প্রবণতাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে যানবাহন চলাচলের জন্য ব্যবহারযোগ্য সড়কের আয়তনও দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং যানজট বাড়ছে। কিন্তু জনগুরুত্বপূর্ণ ওই খসড়া নীতিমালা তৈরির পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ওই নীতিমালার খসড়ায় পার্কিং স্থান তৈরি ও ব্যবহারসহ নানা নির্দেশনা রয়েছে। শহর এলাকার অনুমোদিত রোড সাইন ও মার্কিং দ্বারা চিহ্নিত পার্কিং স্থান ব্যতীত অন্যান্য এলাকার রাস্তার ওপর পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এ নির্দেশনা অমান্য করলে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে নীতিমালায় বলা হয়, রাস্তা ও ফুটপাতের ওপর অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। অবৈধভাবে পার্কিং করা যানবাহনের ফটোগ্রাফ, ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
কী কারণে পাঁচ বছরেও নীতিমালাটি চূড়ান্ত হয়নি সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যথেষ্ট মতামত পাওয়া যায়নি। আমি খোঁজ নেব মন্ত্রণালয়ে। অনেকগুলো কাজ চলমান। আমি যখন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ছিলাম, তখন এ নীতিমালার কাজ শুরু করে ডিটিসিএ।’
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে। নীতিমালা বাস্তবায়নের কাজে তারা এখন মনোযোগী নন। এছাড়া বদলির কারণেও কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। যিনি এ বিষয়ে জেনে-বুঝে উঠেছেন, তিনি বদলি হয়েছেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব নিখিল কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি আজই শুনলাম এ ধরনের কোনো খসড়া নীতিমালা রয়েছে। ডিটিসিএ বা আমার অফিসের কেউ এ বিষয়ে আমাকে কখনো বলেননি। পথচারী নিরাপত্তা খসড়া প্রবিধানমালা, ২০২১ বিষয়েও আমি কিছু জানি না। আমি দুই মাস হয় এসেছি।’
অননুমোদিত পার্কিং ও ফুটপাত দখলের কারণে যানজট ও ভোগান্তি বাড়ছে বলে মনে করে নগরবাসী। চাকরিজীবী আবুল কাশেম নামের এক পথচারী বলেন, ‘ঢাকা শহরের বেশির ভাগ যানজটই হয় অব্যবস্থাপনার কারণে। বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল বা পথচারী কেউই ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলে না। অন্যদের কথাও ভাবে না। সবাই নিজের সুবিধার কথা ভাবে। তাদের কারণে অন্যদের ভোগান্তি হচ্ছে এটি তারা কখনই উপলব্ধি করে না।’
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কার্যালয়। আর এসব ভবনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অবৈধ পার্কিং। এর মধ্যে ওয়াসা ভবনের সামনে ও মেট্রো স্টেশনের নিচে প্রায় সবসময়ই গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। এছাড়া প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের উল্টো পাশেও রয়েছে অবৈধ পার্কিং। এতে যানজটের পাশাপাশি বাড়ে নাগরিক ভোগান্তি।
বাংলা মোটর থেকে মগবাজার যেতে পুরো নিউ ইস্কাটন সড়কের দুই পাশে অসংখ্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান। প্রায় সব দোকানের সামনেই অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করে চলে মেরামতের কাজ।
ফকিরাপুল থেকে নাইটিঙ্গেল মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে গাড়ি পার্কিং, টিটিপাড়া থেকে মুগদা বিশ্বরোড সড়কের এক পাশের এক লেন পণ্যবাহী গাড়ির দখলে। একই চিত্র রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল ও শপিংমলগুলোও তাদের গাড়ি সড়কে পার্কিং করে রাখে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অধিক্ষেত্র হবে বৃহত্তর ঢাকা এলাকার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী জেলা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকা।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ডিটিসিএ পার্কিং সুবিধাদির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজে সমন্বয় ও পরিবীক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। সিটি করপোরেশন, পুলিশ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের মাধ্যমে অন-স্ট্রিট পার্কিং নির্ধারণ করবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পার্কিং সুবিধাদির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পার্কিং সুবিধাদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়োগ প্রদানের সুপারিশও করা হয়েছে নীতিমালায়।
এতে আরো বলা হয়, প্রত্যেক ইমারতের পার্কিং সংস্থানগুলোর উপযোগিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেসব ইমারতে পার্কিং সুবিধাদির ঘাটতি রয়েছে, সেসব ইমারতের ঘাটতি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসারে পূরণ করতে হবে এবং ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব অঞ্চলে পার্কিং সুবিধার ঘাটতি রয়েছে সেসব স্থানে পার্কিং সুবিধাদি নির্মাণ এবং পরিচালনায় বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে হবে। বাস-ট্রাক টার্মিনাল, সিটি বাস ডিপোর সব সুবিধা উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে হবে। এসব টার্মিনাল ও ডিপোয় স্বাস্থ্যকর রেস্তোরাঁ, লাউঞ্জ, ওয়াশ রুম, মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। জনবহুল, ঘনবসতিপূর্ণ, বাণিজ্যিক অথবা প্রশাসনিক ব্যস্ত এলাকার প্লটে/স্থানে ভূমি মালিক নিজেরাই পার্কিং লট নির্মাণ করতে পারেন এবং তাদের পরিচালনার অনুমতি দেয়া যেতে পারে।
রাস্তায় অবৈধ পার্কিং বন্ধ করার জন্য ট্রাফিক পুলিশ অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ রয়েছে খসড়া নীতিমালায়। এতে বলা হয়েছে, পার্কিং নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পার্কিং এনফোর্সমেন্ট সেল গঠন করা যেতে পারে। গণপরিবহন নিবন্ধনের অনুমতি দেয়ার আগেই পার্কিংয়ের স্থান যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। পার্কিং স্থানগুলোকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক থার্মোপ্লাস্টিক পেইন্টের দ্বারা স্থান চিহ্নিত করতে হবে এবং সাইনবোর্ড, ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা, সময়, ফি ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
এতে আরো বলা হয়েছে, কমিউনিটি সেন্টার, পার্ক, খেলাধুলার স্থান, স্টেডিয়াম, পিকনিক স্পট ইত্যাদি স্থানে ছুটির দিনে প্রশস্ত রাস্তার উভয় দিকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে পার্কিং করার ক্ষেত্রে এটির ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করতে হবে, যাতে ওই স্থানের আশপাশের রাস্তায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়। যেসব এলাকায় পার্কিংয়ের চাহিদা জোগানের চেয়ে কম, সেসব এলাকায় পার্কিংয়ের জন্য স্থান চিহ্নিত করে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এ ধরনের পার্কিংয়ের জন্য স্থানীয় সড়ক অথবা শাখা সড়ক ব্যবহার করা যেতে পারে। যেসব এলাকায় পার্কিং চাহিদা জোগানের চেয়ে বেশি, সেসব স্থানে সময়াবদ্ধ পার্কিং ব্যবস্থা নিতে হবে। সময়াবদ্ধ পার্কিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পার্কিং ফি আদায়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।