গণভবন ও সাবেক বিনিয়োগ উপদেষ্টার বাড়ি ভাংচুর

মূল্যবান শিল্প ও চিত্রকর্ম নিয়ে গেছেন অভিজাত ধনীরা

সরকারপ্রধানের পদত্যাগের পর গণভবন, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সরকারদলীয়দের বাসাবাড়িতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় খোয়া যায় চিত্রকলা, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, দৃশ্যশিল্পের নানা উপাদানসহ মূল্যবান অনেক শিল্প ও চিত্রকর্ম। পাথর ও পোড়ামাটির ফলকও লুট হয়েছে। মূলত অভিজাত ধনীরাই সুযোগ বুঝে এসব শিল্প ও চিত্রকর্ম নিয়ে গেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা

সরকারপ্রধানের পদত্যাগের পর গণভবন, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সরকারদলীয়দের বাসাবাড়িতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সময় খোয়া যায় চিত্রকলা, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, দৃশ্যশিল্পের নানা উপাদানসহ মূল্যবান অনেক শিল্প ও চিত্রকর্ম। পাথর ও পোড়ামাটির ফলকও লুট হয়েছে। মূলত অভিজাত ধনীরাই সুযোগ বুঝে এসব শিল্প ও চিত্রকর্ম নিয়ে গেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। 

ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সরকারি দল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ৫ আগস্ট দেশত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই গণভবনে ঢুকে পড়ে কয়েক হাজার মানুষ। লুটপাট করা হয় পশু-পাখি, জামাকাপড়, আসবাব থেকে শুরু করে মূল্যবান সব জিনিসপত্র ও চিত্রকর্ম। ওইদিন বাদ যায়নি বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি, সংসদ ভবন, সরকারদলীয় বিভিন্ন নেতাকর্মীর বাসভবনও। এ তালিকায় রয়েছে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের গুলশান কূটনৈতিক পাড়ার বাড়িটিও।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যখন ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল তখন মূল্যবান শিল্প ও চিত্রকর্মগুলো নিয়ে যান আশপাশের অভিজাত ধনীরা। এসব স্থাপনা, বাড়ি ও ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ছিল দেশবরেণ্য গুণী শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, রশিদ চৌধুরী, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীরদের শিল্পকর্মও।  

শিল্পবোদ্ধারা বলছেন, ধ্বংস বা চুরি হওয়া এমন অনেক শিল্পকর্ম ছিল, যেগুলো পুনরায় তৈরি করা সম্ভব নয়। অমূল্য এ সম্পদগুলো উদ্ধার করতে না পারলে এ ক্ষতি হবে অপূরণীয়।

সংস্কৃতির একটি চিহ্ন হিসেবে এ কাজগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে বলে মনে করেন দেশবরেণ্য গুণী শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যেসব বাড়িতে হামলা হয়েছে, সেগুলোয় বড় ধরনের সংগ্রহশালা ছিল বলে জেনেছি। তাই বড় ক্ষতি হয়ে গেল। তবে এ শিল্পগুলোর একটি বড় অংশ যেহেতু প্রচারিত, সেগুলো যদি আবার বাজারে আসে, ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। কিন্তু ভাংচুরের মধ্যে যেসব জিনিস নষ্ট হয়ে গেল সেগুলো তো আর পাওয়া যাবে না। আমাদের আধুনিক শিল্পের যে ইতিহাস, তার বেশ গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ ছিল হামলার শিকার বাড়িগুলোয়। এখন যারা এসব নিয়েছেন, যদি নষ্ট না করে থাকেন, তাহলে সেগুলো ফেরত দিলে জাতি উপকৃত হবে। অন্যথায় শিল্পগুলো যার বাসায় পাওয়া যাবে তার জন্য সেটি খুব লজ্জার হবে।’ 

ঢাকার কূটনৈতিক পাড়াখ্যাত গুলশান এভিনিউয়ে পাকিস্তান দূতাবাসের পাশেই সালমান এফ রহমানের বাড়ি। ৭১ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়িটিতে এখন আর নম্বর ও নামফলক নেই। লুটপাটের শিকার আর আগুনে পোড়ার পর তিনতলা বাড়িটির নিরাপত্তায় রয়েছেন বেশ কয়েকজন আনসার সদস্য। আছেন বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পুরনো কর্মীরাও। তবে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি।  

জানা যায়, সালমান এফ রহমানের এ বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করা বহু চিত্রকর্ম ছিল। দেয়ালে দেয়ালে ছিল নানা শিল্পকর্মও। কিছু কিছু চিত্রকর্ম ছিল ঐতিহ্যবাহী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত এসব চিত্রকর্ম শোভা পেত তিনতলা বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে। শোনা যায়, বাড়িটিতে ছিল কোটি টাকা দামের চিত্রকর্মও। তবে এখন সেসবের কিছুই অবশিষ্ট নেই। 

দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করা একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, ঘটনার দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট বিকালে শত শত মানুষ বাড়ির দিকে আসতে থাকে। প্রথমে গেটের সামনে থাকা কাচের দরজা ভেঙে ফেলে। পরে একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন এসে ভেতরের গাড়িগুলোয় আগুন দেয়। বাড়ির ভেতরে ঢুকে ভাংচুর চালায় অনেকে। এ হামলার পর কয়েক হাজার মানুষ প্রবেশ করে বাড়িতে থাকা সব নিয়ে যায়। আবার আগুন দিয়ে বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়। এতে বহু শিল্প পুড়ে গেছে। ভাংচুর করায় লণ্ডভণ্ডও হয়েছে অনেকগুলো। 

চিত্রকর্ম ও নানা শিল্প নিদর্শনের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করা ওই ব্যক্তি বলেন, ‘হামলার পর আশপাশ এলাকা থেকে প্রচুর টোকাই প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে এলাকার বহু বিত্তবানও আসেন। যে যার মতো করে জিনিসপত্র ভাংচুর করেন, আবার নিয়েও যান। আমি তখন তাদের মধ্যে মিশে যাই। চেয়ে চেয়ে দেখেছি, কিছুই করার সুযোগ ছিল না। দেয়ালে টাঙানো নানা আর্ট, ছবি, বিদেশী নানা পাথরের চিত্রকর্ম মূলত ধনীরাই নিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার টোকাইদের কাছ থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ১০০-৫০০ টাকায় এগুলো কিনে নিয়েছেন। এ বাড়িতে যারা লুটপাট চালিয়েছে তারা আশপাশের বাড়ি থেকেই বেশি এসেছেন।’

বাড়িটিতে ঢুকে লুটপাট চালানোর বেশ কয়েকটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে এক নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘আরে ভিডিও করছেন কেন, সবাই তো নিচ্ছে, তাই আমরাও নিচ্ছি।’ 

যোগাযোগ করা হলে সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ সায়ান ফজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বহু মূল্যবান জিনিস ছিল। সবই নিয়ে গেছে, ধ্বংস করে ফেলেছে। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই আমার।’ 

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়েও শুধু ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার যেসব চিহ্ন ওই বাড়িতে ছিল তার সবই এখন নিশ্চিহ্ন। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরটিতেও ছিল বহু গুণী শিল্পীর শিল্পকর্ম। অস্তিত্ব নেই সেগুলোরও।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরের পর পরই জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবন গণভবনেও একই ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার দিন সরজমিন দেখা যায়, নান্দনিক নানা পণ্য, শিল্পকর্ম নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বহু ভিডিও চিত্রেও দেখা গেছে, সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষকে গণভবন থেকে নানা পণ্য নিয়ে যেতে। কেউ কেউ ভিডিও দেখে পরিচয় শনাক্ত করে নিন্দা জানিয়েছেন ওইসব ব্যক্তিকে। অনেকেই আবার নিয়ে যাওয়া পণ্য ফেরত দিয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

শিল্পী ও কিউরেটর মোস্তফা জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংসদে সবচেয়ে বেশি ছিল দেশবরেণ্য গুণী শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাজ। এমনকি ৩২ নম্বরেও ছিল। সেগুলো লুটপাট হয়েছে। অনেকে বহু বই নিয়ে গেছে। এসব ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা উচিত। কারণ এগুলো সবই রাষ্ট্রের সম্পদ। শিল্পকর্মগুলো কিন্তু বাংলাদেশেরই বেশি। ফলে এগুলো কেউ বিদেশে নিয়ে যাওয়া বা সেখানে ব্যবহার করা, বিক্রি করা সহজ হবে না।’

আরও