সাতক্ষীরা উপকূলের ৬৮৩ কিলোমিটার বে‌ড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ধস ভাঙন আতঙ্কে লাখো মানুষ

কোথাও ধস, কোথাও ফাটল, আবার কোথাও জোয়ারের পানির চাপে বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উপকূলীয় দুর্যোগপ্রবণ জেলা সাতক্ষীরা। ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দেশের বেশির ভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনো আঘাত হানে সরাসরি, আবার কখনো বয়ে যায় এ জেলার ওপর দিয়ে। এর প্রভাবে জেলাটির প্রধান প্রধান নদ-নদীর বেড়িবাঁধে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। কোথাও ধস, কোথাও ফাটল, আবার কোথাও জোয়ারের পানির চাপে বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পা‌নি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাব অনুযায়ী, সাতক্ষীরার উপকূলীয় বি‌ভিন্ন নদ-নদীর ৬৮৩ কিলোমিটার বে‌ড়িবাঁধ ক্ষ‌তিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এতে ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে উপকূলের লাখো মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার দায়সারা সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ অপচয় হলেও টেকসই কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে জোয়ারের পানির চাপে যেকোনো মুহূর্তে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি ঢুকে মাছের ঘের, ফসলের জমি ও বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে উপকূলের লাখো মানুষের। তাদের দাবি, উপকূল রক্ষা করতে হলে বেড়িবাঁধের টেকসই সংস্কারের বিকল্প নেই। তবে পাউবো জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা বিভাগ-১-এর অধীনে ৩৮৩ কিলোমিটার এবং বিভাগ-২-এর অধীনে ৩০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। উপকূলে কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, মাদার, চুনা, গলগেসিয়া, বেতনা, মরিচ্চাপ, কালিন্দী, ইছামতিসহ ২৭টি ছোট-বড় নদ-নদী রয়েছে। এসব নদ-নদীর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বর্ষা কিংবা দুর্যোগের পূর্বাভাস এলেই বাঁধসংলগ্ন কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দেয়। জানা গেছে, ষাটের দশকের বিভিন্ন সময়ে এসব বাঁধ নির্মাণ হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণের পর থেকে এ দীর্ঘ সময়ে টেকসই কোনো সংস্কার না হওয়ায় এসব নদ-নদীর বে‌ড়িবাঁধ এখন নানাভাবে ক্ষ‌তিগ্রস্ত হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় আইলাদুর্গত পদ্মপুকুর ইউনিয়নের কামালকা‌টি গ্রামের পরিতোষ কুমার জানান, খোলপেটুয়া নদীর তীব্র ভাঙনে তাদের বসতবা‌ড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রতি বছর ঝড় ও বর্ষা মৌসুমে বা‌ড়িঘর ফেলে তাদের অন্যত্র চলে যেতে হয়। একই ধরনের কথা জানান গ্রামটির বাসিন্দা গোপাল মণ্ডল ও অনাদী কুমার। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদীর পাড়ের মানুষের এমন ক্ষ‌তি হওয়ার পরও পা‌উবো কখনো টেকসই বে‌ড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেয় না। জরুরি প্রকল্পের নামে দায়সারা সংস্কার করে কর্তৃপক্ষ। সংস্কারের পর কিছু দিন যেতে না যেতেই আবার শুরু হয় ভাঙন। বেড়িবাঁধগুলোর টেকসই সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসী।

একই ইউনিয়নের বন্যাতলা গ্রামের আব্দুল্লাহ সরদার ও ছ‌মিরন বিবি জানান, প্রতি বছর কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে তাদের বা‌ড়ি লোনা পা‌নিতে ত‌লিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে তাদের গ্রামে বিশাল এলাকাজুড়ে বে‌ড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এছাড়া পা‌নি যেভাবে বাড়ছে তাতে বড় ক্ষ‌তির আশঙ্কা করছেন তারা।

শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের চা‌রপাশ নদীবেষ্টিত। কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদীর ভাঙনে বন্যাতলা, কামালকা‌টি, ঝাপা, খুঁটিকাটা, প‌শ্চিম পাতাখালী, পূর্ব পাতাখালী, চণ্ডাপুর ও চাউলখোলা গ্রামসহ ইউনিয়নের ২৮ কিলো‌মিটার বে‌ড়িবাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষ‌তিগ্রস্ত।

তি‌নি বলেন, ‘শুধু ভাঙনের পর সংস্কার নয়, বাঁধের স্থায়িত্ব বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। বাঁধের নকশা অনুযায়ী মাটি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার, জিওব্যাগ স্থাপন, নদীর তীব্র স্রো‌তে গতিপথ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নির্মাণকাজে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বারবার সংস্কার করেও উপকূলবাসীর ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।’

এদিকে উপকূলের মানুষের আশঙ্কা, এখন বর্ষা ও দুর্যোগের মৌসুম চলছে। বেড়িবাঁধে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোর কোনোটি ভেঙে গেলে মুহূর্তেই লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়বে। এতে কৃষিজমি, মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকায় বড় প্রভাব পড়বে।

আশাশু‌নি উপজেলার আনু‌লিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস জানান, তার ইউনিয়নের কাকব‌সিয়া খেয়াঘাট এলাকার দেড় কিলো‌মিটার ও মণিপুর গ্রামের কয়েক‌টি পয়েন্টে খোলপেটুয়া নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে আগামী অমাবস্যা বা পূর্ণিমায় নদীর পা‌নি বৃ‌দ্ধি ও তীব্র স্রো‌তে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তি‌নি।

সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বিভাগের আওতায় ৩৮৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় এরই মধ্যে সংস্কারকাজ চলছে। পাশাপাশি অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জোয়ারের চাপ বা প্রাকৃতিক কারণে কোনো স্থানে হঠাৎ ক্ষতি হলে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিভাগের আওতায় ৩০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে আশাশুনির প্রতাপনগর ও আনুলিয়া এবং শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর স্বাভাবিক স্রোত, জোয়ারের চাপ, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় এলাকায় নদীর বে‌ড়িবাঁধ ক্ষ‌তিগ্রস্ত হয়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।’

আরও