চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন (আলোচনা) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই এগোচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হবে।
আজ বুধবার চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবন উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব আমাদের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়েছিল উল্লেখ করে এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের শতভাগ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের প্রায় ২৬ লাখ মানুষ কাজ করেন। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসে। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক ও পারস্পরিক কমিটমেন্টের অংশ হিসেবেই প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেই কমিটমেন্ট বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়ছে।
এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্টের অ্যাভেইলেবিলিটি প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ৯৩ শতাংশের বেশি। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এ সক্ষমতা আরো কমে ৫০ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বর্তমানে বন্দরের যে সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা অর্জিত হয়েছে, তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি জানান, সরকার যদি নিজ উদ্যোগে নতুন ক্রেন ও অন্যান্য ইক্যুইপমেন্ট কিনতে চায়, তাহলে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয় হবে। শুধু অর্থ ব্যয়ই নয়, এসব যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও স্থাপনে তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপারেটর দায়িত্ব পেলে তারা নিজেদের বিনিয়োগেই এক বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এনে কার্যক্রম চালু করতে পারবে। কারণ বিনিয়োগের বিপরীতে আয় নিশ্চিত করাই তাদের ব্যবসায়িক লক্ষ্য।
তিনি জানান, সম্প্রতি দুবাইয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নতুন কিছু কমিটমেন্ট দেয়া হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে নবগঠিত কমিটি কাজ করছে। এটি অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। সহজ হলে অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত।
এনসিটি পরিচালনায় বিদেশী অপারেটর নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, নেগোসিয়েশনে আমরা দেশের স্বার্থে কোনো ছাড় দেব না। দেশ ও জনগণের স্বার্থই সবার আগে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এর আগে তিনি নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার বন্দরের অভ্যন্তরে থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার মানুষকে বন্দরে প্রবেশ করতে হতো, যা নিরাপত্তা ও পরিচালনায় চাপ সৃষ্টি করত। নতুন ভবন চালুর ফলে সেই চাপ কমবে এবং বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরো শক্তিশালী হবে।
তিনি জানান, প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি আন্তর্জাতিক আইএসপিএস অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি থেকে মাসে প্রায় ৫ কোটি টাকা আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি বন্দরের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২২ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। নিচতলায় রিসেপশন, প্রথম তলায় টোকেন বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভবনের প্রতিটি তলায় ব্যাংকিং সুবিধা রয়েছে। তিনটি তলায় বন্দরের বিভিন্ন সেবা দেওয়া হবে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং বাকি তিনটি তলা বন্দরের নিজস্ব প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হবে।