নওগাঁয় সাত সৌদি প্রবাসীর দাফন সম্পন্ন, গ্রামে গ্রামে কান্নার রোল

সৌদি আরবের সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো নওগাঁর সাত প্রবাসীকে নিজ নিজ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে আত্রাই উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে তাদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নিহতদের মরদেহ নেয়া হয় গন্ডগোহালী, পারকাসুন্দা, উদনপৈ ও দুবাই গ্রামে। সেখানে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে স্বজনরা তাদের দাফন করেন।

সাত প্রবাসীর করুণ মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো আত্রাইয়ে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। প্রবাসী এসব পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান ও সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, শুক্রবার সকাল থেকেই আত্রাই থানা চত্বরে ভিড় করতে থাকেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে চারটি ফ্রিজিং গাড়িতে মরদেহগুলো আত্রাইয়ে পৌঁছায়। সকাল ১০টার দিকে থানা চত্বর থেকে মরদেহগুলো নেয়া হয় মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল কলেজ মাঠে। উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা। এতে নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্থানীয়রা অংশ নেন।

জানাজা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর একে একে মরদেহগুলো পৌঁছে দেয়া হয় নিহতদের নিজ নিজ গ্রামে। মরদেহগুলো তাদের নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছালে চোখের জলে শেষ বিদায় জানাতে ঢল নামে অগণিত মানুষের। সবচেয়ে বেশি আহাজারি চোখে পড়ে গন্ডগোহালী গ্রামে। কারণ ৭ প্রবাসীর চারজনই এ গ্রামের। মৃতদেহ বহনকারী গাড়ি যখন গন্ডগোহালী গ্রামে প্রবেশ করে, তখন আকাশে-বাতাসে কেবলই কান্না আর আহাজারির শব্দ।

দুই সন্তান মোহন ও সুমনের কফিন দেখেই চিৎকার করে উঠেন ময়না। প্রতিবন্ধী স্বামীকে নিয়ে কি করে পার করবেন আগামীর কঠিন দিনগুলো, কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বার বার এমনটিই বলছিলেন মা ময়না বেগম । তিনি বলেন, দুই ছেলের উপার্জনে সংসারের খরচ চলত। লাখ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলে দুটোকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। আমার ছেলে দুটো বলত, মা, আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকব। আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল। আমার আর কিছু থাকল না। আমার স্বামীও প্রতিবন্ধী। তাকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে অনুরোধ, সরকার যেন আমাদের পাশে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে একই গ্রামের একমাত্র সন্তান কলিম উদ্দিনের মৃতদেহ দেখে নাম ধরে ডাকতে থাকেন মা কারিমা বেগম। এক পর্যায়ে সন্তান হারানোর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন তিনি। মাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে কলিম উদ্দিনের ছোট বোন নাদিরা বলেন, আমার ভাই বেঁচে থাকলে সারাজীবন আয় করে মার ভরণপোষণ করতেন। সেই ভাই এখন আজীবনের জন্য হারিয়ে গেল। অথচ এ মাসেই দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল ভাইয়ের। আমাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

দুবাই গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ছেলেগুলো ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিল। ধারদেনা পরিশোধ করে কেবল সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিল। এর মধ্যেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আমরা এ ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত। আমাদের গ্রামের আরো অনেকেই সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা এখন শঙ্কিত। একসঙ্গে এতোগুলো মরদেহ আগে কখনো আমরা দেখিনি আত্রাইয়ে।

নওগাঁ জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জোবায়ের হোসেন বলেন, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রায় সবাই অবৈধভাবে ওই দেশের সোফা কারখানায় কাজ করতেন। বৈধভাবে কাজ করলে মোটা অংকের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেত পরিবারগুলো। এক্ষেত্রে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই শোকেস্তব্ধ অসহায় পরিবারগুলোর পাশে বাংলাদেশের সরকারকেই দাঁড়াতে হবে। নয়তো অভাব অনটন ও ঋণের বোঝা তাদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলতে পারে।

নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু বলেন, নিহতদের পরিবারগুলোকে ওয়েজ ওনার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাকি মরদেহগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সৌদি দূতাবাস থেকে পাঠানো তালিকায় শনাক্ত নওগাঁর সাতজন হলেন, আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গন্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিম উদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।

আরও