১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর। এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করে তিন জোট। এদিকে ক্ষমতা ধরে রাখতে অটল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আন্দোলন একপর্যায়ে রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। ওই সময় তৎকালীন সেনাপ্রধানসহ পুরো সেনাবাহিনী অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীদের পক্ষে। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন এরশাদ। এর ৩৪ বছর পর গত বছরের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। নড়বড়ে হয়ে যায় শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসন। ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট নানা কৌশলে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করেন শেখ হাসিনা। বিক্ষোভ দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। শত শত মানুষকে হত্যা করেও আন্দোলন দমাতে পারেনি হাসিনা সরকার, বরং আরো তীব্র হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকেও গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায়নি সেনাবাহিনী। সবশেষে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালান শেখ হাসিনা।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী দুটি গণ-অভ্যুত্থানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী। ফলে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এ দুই গণ-অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে না দাঁড়ালে প্রাণহানি ও বিশৃঙ্খলার ভিন্ন রূপ দেখা যেত।
কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছরের জুনের প্রথম সপ্তাহে আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে সংগঠিত হয়। সেই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে ২০১৮ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তি পুনরায় বহালের দাবিতে টিএসসিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ক্রমেই বিক্ষোভ জোরালো হতে থাকে। একপর্যায়ে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরো জোরালো রূপ নেয়। একদিকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা দেশে, এর সঙ্গে বাড়তে থাকে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়ন।
দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্দোলন রূপ নেয় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে। সর্বশেষ সেনাবাহিনীকেও মাঠে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেয়া হয়। ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তাদের মনোভাব জানতে চান। ওই আলোচনায় ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগের রাতেও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, কারফিউ বলবৎ করতে বেসামরিক মানুষের ওপর সেনা সদস্যরা গুলি চালাবে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন সেনা কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানায় রয়টার্স।
এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণার পর ঢাকার রাস্তায় জনতার উল্লাস ছবি: শহিদুল আলম
এ প্রসঙ্গে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণ দৃষ্টিতে পেশাদার হিসেবে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব সরকারকে সমর্থন দেয়া। সেনাপ্রধান সমর্থন না দিলে তা বাহিনীর শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবেই গণ্য হয়। কিন্তু নব্বই ও চব্বিশ—উভয় ক্ষেত্রে দুজন সেনাপ্রধানই ঝুঁকি নিয়ে সরকারের নির্দেশের বাইরে গিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। যেজন্য সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।’
চাকরিরত সদস্যদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সে সময়। শেখ হাসিনার পতনের আগের দিন (৪ আগস্ট) অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পক্ষে মহাখালী ডিওএইচএসের রাওয়া ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন হয়। সে সম্মেলনে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সেনাপ্রধান এম নুরুদ্দিন খান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর পাশাপাশি যে ক্ষয়ক্ষতি, দুর্দশা ও রক্তপাত হয়েছে, তা মর্মান্তিক। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গতকাল (৩ আগস্ট) যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে আমি আশ্বস্ত হয়েছি। আশা করছি, তিনি সে সিদ্ধান্ত বলবৎ রাখবেন। দেশে আর রক্তপাত হবে না।’
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দেন, কিন্তু সেনাপ্রধান এ নির্দেশ না মানায় আন্দোলন ছাত্র-জনতার অনুকূলে চলে যায়। শুধু তা-ই নয়, ট্যাংকে উঠলেও সেনাবাহিনী যে গুলি করবে না সেটা বুঝে যায় তারা। ফলে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য ও তাদের পরিবার বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে মিছিল করতে থাকে।’
১৯৮২ সালের মার্চে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতা গ্রহণের সময় এরশাদের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিল জাসদ ছাত্রলীগ। তখন থেকে এরশাদের পতনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করে। একই সময়ে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছিল। এর সূত্রপাত ঘটে বিরাশির শিক্ষা আন্দোলনের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে, যা পরে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে আরো জোরালো হতে থাকে।
নব্বইয়ের অক্টোবরে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরো গতিশীল হয়ে ওঠে। পরের মাসেই সারা দেশে অচলাবস্থা তৈরি হয়। প্রায় ২৪টি ছাত্রসংগঠন একযোগে সে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক ও সরকারি কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। অনেকেই কর্মবিরতিতে চলে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে ৩ ডিসেম্বর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শান্তি আলোচনা করতে রাজি হন। কিন্তু এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে পরের দিন লাখো মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম নুরুদ্দিন খান। সেনাবাহিনী সরকারের পক্ষ হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের ওই সময়টায় জাতীয় পার্টির পানি উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মেজর (অব.) মনজুর কাদের। তিনি বলেন, ‘নভেম্বরের মাঝামাঝিতে আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। তৎকালীন সেনাপ্রধান এম নুরুদ্দিন খান আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান নেন। এরশাদ বুঝে যান সেনাবাহিনীকে তিনি পাশে পাবেন না। ফলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে পতনের ঠিক আগের দিন এরশাদ সেনাপ্রধানকে ফোনকলও দিয়েছেন। কিন্তু সেনাপ্রধান রিসিভ করেননি। অবশেষে বাধ্য হয়ে সাংবিধানিকভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এরশাদ।’
মনজুর কাদের জানান, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের পরই বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আবারো ক্ষমতায় আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এরশাদ। এতে ছাত্ররা আবারো ফুঁসে ওঠে। পরে এরশাদকে গ্রেফতার করা হয়।’