বর্ষা শুরুর আগেই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন ও বড় বড় ফাটলের কারণে বাঁধের অন্তত ২০টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে এলাকাবাসী বন্যার আশঙ্কা করছে। তাদের দাবি, এখনই বাঁধ মেরামতের।
কমলগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধলাই নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের লংতরাই পাহাড় থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। খরস্রোতা এ নদীর ভাঙনে প্রায় প্রতি বছরই বন্যায় প্লাবিত হয় কমলগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সময়মতো প্রতিরক্ষা বাঁধের সংস্কারকাজ না হওয়ার কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন তারা।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জের ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ধস। এতে বাঁধের অন্তত ২০টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কমলগঞ্জ পৌর এলাকার আলেপুর, করিমপুর, বড়গাছ ও উজিরপুর, মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, বাধে করিমপুর, ধাঁতাইলগাঁও, খুশালপুর, ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল, কালারায়বিল, আদমপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ তিলকপুর, উত্তর ঘোড়ামারা, রানীরবাজার এবং মাধবপুর ইউনিয়নের কাটাবিল, শুকুর উল্যাহগাঁও ও ধলাইরপাড় এলাকায় বাঁধ ঝুঁকির মুখে। রহিমপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুরসহ অতি ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি স্থানে সংস্কারকাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সরেজমিনে মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুরসহ কয়েকটি স্থানে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমের আগেই কয়েক দফা নদীর পানি বেড়ে বাঁধে ধস শুরু হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভাঙতে ভাঙতে দুই-পাঁচ ফুট জায়গা রয়েছে অবশিষ্ট।
স্থানীয়রা জানান, এ এলাকায় এক যুগ থেকে নদীভাঙন অব্যাহত আছে। মুন্সিবাজার ইউনিয়নের বাধে করিমপুর নামে একটি গ্রাম নদীভাঙনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অনেকের বাড়িঘর, ফসলি জমিসহ অনেক স্থাপনা। এ বছর বর্ষা শুরুর আগেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো জরুরি মেরামত করা না হলে নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হবে।
উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা সুনু মিয়া বলেন, নদী অনেক দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে বাধে করিমপুর গ্রামটি নিশ্চিহ্ন করে এখন সুরানন্দপুর গ্রামে ভাঙন ধরেছে। এ গ্রামের অনেকে একাধিকবার বাড়িঘর সরিয়েছেন। পানি বাড়লে নদীপাড়ের মানুষ আতঙ্কে থাকে। রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিতে হয় স্থানীয়দের।
একই এলাকার বাসিন্দা নশাদ খাঁ বলেন, বর্ষা আসতে না আসতেই শুরু হয়েছে প্রতিরক্ষা বাঁধে ধস। আমরা সব হারিয়ে এখন সহায়-সম্বলহীন। আপত্কালীন ব্যবস্থা না করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সেজন্য আগে নদী ভাঙন ঠেকাতে হবে।
স্থানীয়রা জানান, কমলগঞ্জ পৌরসভার করিমপুর এলাকায় ধলাই নদীর বাঁধে নতুন করে অন্তত ১০ ফুট ফাটল দেখা দিয়েছে। নদীতে মাটি ধসে পড়া শুরু হয়েছে। ভাঙতে ভাঙতে মাত্র এক ফুট বাঁধ রয়েছে। এতে আতঙ্কগ্রস্ত পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডবাসী।
কমলগঞ্জ পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুর রহিম মুহিন জানান, করিমপুর এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধে ধস শুরু হয়েছে। প্রায় ১০ ফুট বাঁধের মাটি পানির নিচে চলে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে বাঁধটি ভেঙে যেতে পারে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
মুন্সিবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাহিদ আহমদ তরফদার বলেন, ধলাই নদীর ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড মেরামত করলেও নতুন করে কয়েকটি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর আগে এ এলাকা কয়েক দফায় প্লাবিত হয়েছিল। এবার আরো খারাপ অবস্থা। পানি পাড়লেই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের অংশটুকু ভেঙে মুন্সিবাজার ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হবে। শুধু বাঁধ মেরামত নয়, নদী খননের দাবি জানান তিনি।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ভারত থেকে নেমে আসা ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ধলাই নদী পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে। তাই অল্প বৃষ্টিতেই দেখা দেয় বন্যার আশঙ্কা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। কিছু কিছু স্থানে কাজ শুরু হয়েছে আর যেগুলো বাকি আছে সেগুলোতেও কাজ শুরু হবে।
তিনি আরো বলেন, ধলাই নদীর বন্যার স্থায়ী সমাধানে বড় প্রকল্প দরকার। এরই মধ্যে হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।