রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কভিড-১৯ মোকাবেলা করতে আরো জনবল চাইছে জাতিসংঘ। এ পরিস্থিতিতে ৬৩ জনের তালিকা পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ের কাছে। এর মধ্যে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত ১৯ জনকে আনার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে পূর্ণ তালিকা ধরে জনবল চার্টার করে নিয়ে আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে জাতিসংঘ। এ নিয়ে বিরক্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে সংকটপূর্ণ ঘোষণা করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধু নিতান্তই জরুরি সেবা সেখানে চলমান রয়েছে। ক্যাম্পে যেহেতু কোনো রোহিঙ্গা এখনো কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়নি, ফলে বাইরের মানুষের সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতরে খুবই কম মানুষকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। যাদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে, তারা জরুরি সেবাদানে নিয়োজিত। এ পরিস্থিতিতে ক্যাম্পে কভিড-১৯ মোকাবেলায় তালিকা পাঠিয়ে ৬৩ জনের অতিরিক্ত জনবল চাইছে জাতিসংঘ। তাদের দেশের বাইরে থেকে নিয়ে আসতে চায় সংস্থাটি। তবে তাদের মধ্যে ১৯ জনকে অনুমোদন দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। করোনা পরিস্থিতিতে যখন সব ফ্লাইট বর্তমানে স্থগিত, তখন ফ্লাইট চার্টার করে তাদের নিয়ে আসতে চায় জাতিসংঘ।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, জাতিসংঘের তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে শুধু যারা চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত, তাদের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাকিদের চিকিৎসাসেবায় কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাদের আসতে দেয়ার যুক্তি পরিষ্কার নয়।
৬৩ জনের মধ্যে ১৫ জনের মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। আর চারজনের মেডিকেল প্রশাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর বাইরে কেউই কভিড-১৯ সেবাদানে যোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এ মানুষগুলোকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার জন্য সংস্থাটি আমাদের বেশ চাপ প্রয়োগ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কয়েকজন উপদেষ্টা দিয়েও তদবির করিয়েছে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়।
তিনি বলেন, কভিড-১৯-এর এ মহামারীতে যখন সব ফ্লাইট বন্ধ, তখন তারা ফ্লাইট চার্টার করে এদের আনতে চায়। আমরা তাদের জানিয়েছি, ইউরোপের দেশগুলোতে যেসব বাংলাদেশী বর্তমানে আটকে পড়েছেন, তাদের তোমরা চার্টার করে নিয়ে আসো। তখন জাতিসংঘ এর সঙ্গে আরো ৪০ জনের চাহিদা দিয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করানোর জন্য। সবাইকে আসতে দিলে আটকে পড়া কিছু বাংলাদেশীকে তারা নিয়ে আসবে। আমরা তাদের প্রস্তাব না করে দিয়েছি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, যেখানে এখন পর্যন্ত জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) টাকা ঠিকমতো জোগাড় করা যায়নি। জেআরপি ২০২০-এর ঠিকমতো কোনো নিশ্চয়তা নেই। আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে প্রস্তুতি এখনো ঠিকমতো সম্পন্ন করতে পারেনি। কভিড-১৯-এর জন্য ফান্ড সংকট রয়েছে। সেখানে ফ্লাইট চার্টার করে জনবল নিয়ে আসা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমানে কতজন স্থানীয় ক্যাম্পে কোন পর্যায়ে কাজ করছে, আর কতজন বিদেশী কাজ করছে তা জাতিসংঘের ভেবে দেখা উচিত। তাদের খরচ করা অর্থ কতটুকু বেতন ও ভাতাতে খরচ হচ্ছে। আর রোহিঙ্গাদের পিছে কতটুকু খরচ করছে, তার হিসাব নিয়ে তাদের সামনে আসা উচিত। পুরো প্রক্রিয়াটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেখানকার স্থানীয় জনগণ। তাদের পিছে জনপ্রতি কত টাকা খরচ করা হয়েছে, তারও হিসাব সামনে আসা উচিত। কিন্তু মানবিক কাজের চেয়ে অতিরিক্ত জনবলে মনোযোগ যাচ্ছে বেশি।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পোর কাছে এ বিষয়গুলোতে জানতে চাইলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
এদিকে জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বসবাস করায় এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এ ভাইরাসটি দ্রুত সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) মাধ্যমে এখন পর্যন্ত একজনেরও কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার নিশ্চিত ঘটনা পাওয়া যায়নি। শরণার্থী ত্রান ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) নিদের্শনা অনুযায়ী ক্যাম্পগুলোতে শুধু অতি জরুরি পরিষেবা অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্য ও রান্নার জ্বালানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যবিধি প্রচারণা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন কার্যক্রমসহ নতুন আসা রোহিঙ্গাদের আলাদা করে রাখার মতো সেবাগুলোই বর্তমানে ক্যাম্পে চালু রয়েছে। ক্যাম্পে কভিড-১৯ যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, এজন্য সহায়তা কার্যক্রমকে সীমিত করা হয়েছে।