নদী গবেষকরা বলছেন, আগামী এক দশকে পদ্মার গতিপথে আরো বদল আসবে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে জলবায়ু পরিবর্তন ও পদ্মা সেতুর প্রভাব। দেশের প্রধান এ নদীর গতিপথে দ্রুত দেশের ভূপ্রকৃতি, জনজীবন ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব রাখতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নদী গবেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালে পদ্মা নদীর গতিপথ আরো বেশি পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে। নদীটি এখন আগের তুলনায় বেশি আঁকাবাঁকা ও বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রভাবেও নদীর গতিপথ ও গঠন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর ফলে কোথাও তীব্র নদীভাঙন, আবার কোথাও দ্রুত পলি জমে নতুন চর সৃষ্টি হচ্ছে।
বিভিন্ন সময় পদ্মার ভাঙনের ধরন নিয়ে স্যাটেলাইট ইমেজভিত্তিক একাধিক গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা যায়, পদ্মার ভাঙন ও চর জাগার প্রবণতা প্রায় সমান। কখনো কখনো চর জাগার পরিমাণ বেশিও দেখা গেছে। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সালে পদ্মার ভাঙন নিয়ে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস আর্থ এক্সপ্লোরারের স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২০ বছরে পদ্মা সেতু সংলগ্ন এলাকায় ১৫৫ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা বা ১৫ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে নতুন চর জেগেছে ১২৫ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার বা ১২ হাজার ৫২০ হেক্টর। অর্থাৎ এ সময়ে প্রায় ৩০ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা বা ৩ হাজার ৪০ হেক্টর জমি স্থায়ীভাবে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ থেকে ২০২৫—এ দুই দশকের মধ্যে পদ্মা নদীর ভাঙন সবচেয়ে তীব্র ছিল ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। মূলত এ সময়কালে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলমান ছিল। সেতু নির্মাণের আগে এবং সেতু নির্মাণের পর পদ্মার ভাঙন ও চর জাগার প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সেতু নির্মাণকালে পদ্মার ভাঙন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এ সময় ১৩৭ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভেঙে যায়। বিপরীতে চর জেগেছে ৯৮ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ভাঙা ও গড়ার এ কালপর্বে পদ্মার আয়তন বেড়ে যায় ৩৮ দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে নদীর স্থির এলাকাও ছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ২০৮ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার। পদ্মা নদীর জলশক্তি, প্রকৃতি নিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) তিনজন গবেষকের এক গবেষণায় এসব পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।
পদ্মার ভাঙন নিয়ে নদী গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীটির ভাঙন এখন কোনো নিয়ম মানছে না। এটি ক্রমেই এলোমেলোভাবে বসতির দিকে ধেয়ে আসছে। যে কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় থেকে মাদারীপুরের চর জানাজাত এলাকা পুরোটাই ভেঙে বিলীন হয়ে যায়। অন্যদিকে এর চর জাগছে জনমানবহীন এলাকার দিকে।
পদ্মা সেতু নির্মাণের পর নদীভাঙনের চেয়ে চর জাগার পরিমাণ বেড়ে যায়। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল—এ পাঁচ বছরে নদীতে নতুন চর জেগেছে ৭৮ দশমিক ৭১ বর্গকিলোমিটার। বিপরীতে নদী ভেঙেছে ৬৮ দশমিক ৯৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা। অর্থাৎ এ পাঁচ বছরে নদীতে নতুন করে প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটারের মতো চর বা ভূমি যুক্ত হয়েছে।
পদ্মা সেতু নির্মাণকালের আগের পাঁচ বছরে অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ সময়ে নদীটি ভেঙেছে ৮১ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার এবং চর জেগেছে ৭৬ দশমিক ২১ বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে ভাঙন বেশি হওয়ায় নদীটি আরো চওড়া হতে থাকে। অর্থাৎ নদীর আয়তন প্রায় ৫ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার বেড়ে যায়।
২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নদীটি প্রায় শান্তই ছিল। এ পাঁচ বছরে পদ্মা ভাঙে ৭৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার এলাকা এবং চর জাগে ৮০ দশমিক ৩১ বর্গকিলোমিটার। এ সময়ে নদীটি ৪ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার সংকুচিত হয়।
নদী ও পানিসম্পদ গবেষক ড. আইনুন নিশাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদী ভাঙবে এটাই নদীর চরিত্র। এ ভাঙন রোধ করতে চাইলে নদীর দুই পাশেই শাসন করতে হবে। আর নদীর ভাঙন কখনো নিয়ম মেনে হয় না। তবে পদ্মা সেতুর যেখানে আমরা নদী শাসন করেছি, সেখানে আর নদী ভাঙবে না।’
বর্তমানে পদ্মা নদীর তীর প্রায়ই পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে ভাঙন বেশি দেখা যাচ্ছে, আর পূর্ব তীরে পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হচ্ছে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার পর আশপাশের কিছু এলাকায় নদীর গতিপথ তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। অন্যদিকে পদ্মা-মেঘনা সঙ্গম এলাকা এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল, বিশেষ করে বর্ষাকালে সেখানে নদীর গতিপথ দ্রুত বদলায়।
নদীর এ পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো পদ্মা সেতু, যা নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে পরিবর্তন এনে কিছু এলাকায় ভাঙন বাড়িয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে মাদারীপুর ও শরীয়তপুর অঞ্চলের নদীতীরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে চর জানাজাত। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সেখানে বহু পরিবার জমি হারিয়েছে এবং অনেকে হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। এছাড়া রাজবাড়ী জেলাও নদীভাঙনের বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নদী গবেষক এআরএম খালেকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২১ সালে নদী রক্ষা কমিশনের সঙ্গে ৫৭টি নদীর মরফোলজি স্টাডি নিয়ে কাজ করি। তখন পদ্মা ও আশপাশের নদীর ভাঙনটি আমরা সরজমিনে দেখেছি। নদীর স্রোতের একটি স্বাভাবিক প্রবাহ আছে। এ প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় চরের মাধ্যমে। চরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নদীর স্রোত চারপাশে ছড়িয়ে যায়। যে কারণে ভাঙন একদিকে না হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘পদ্মা নদীর বসতি এলাকার মাটির ৩০ থেকে ৩৫ ফুট গভীরে বালির স্তর রয়েছে। এভাবে স্রোত ছড়িয়ে পড়লে বালিগুলো স্রোতের সঙ্গে চলে যায় আর এলাকাটি ভেঙে যায়। যে লেভেলে গিয়ে বালি সরে যায়, ওই লেভেলে যদি জিও ব্যাগ বা আধুনিক কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে বালিটা আটকে রাখা যায়, বিশেষ করে গোয়ালন্দের পর যদি পদ্মার প্রবাহ একটা স্রোতেই রাখা যায়, তাহলে পদ্মা ব্রিজও নিরাপদ থাকবে, আবার ভাঙনও কমে যাবে।’
পদ্মা দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে পদ্মা আকার ও গতিপথ পরিবর্তন করেছে ধারাবাহিকভাবে। আর বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরেক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভাটি অঞ্চলের পাশাপাশি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে পদ্মার উজানেও বেড়েছে ভাঙনপ্রবণতা। ভাঙনের পাশাপাশি পদ্মায় জেগে উঠছে নতুন চর।
পদ্মা নদীর ভাঙন নিয়ে কয়েক বছর আগে গবেষণা করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের চারজন গবেষক। তারা বলেছেন, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল—এ ১০ বছরে পদ্মা নদীর ভাঙনের চেয়ে চর জাগার পরিমাণ বেড়েছে। পদ্মার ভাঙন সম্পর্কে তারা বলেছেন, পদ্মার ভাঙনের ধরন নিয়ে আগাম কিছু বলা যায় না। এটার ভাঙন হঠাৎ করেই হয়। তবে এ ১০ বছরে ভাঙনের চেয়ে ৬ হাজার ৬০১ হেক্টর জমি চর হিসেবে যুক্ত হয়েছে। প্রতি বছর ৯০৮ হেক্টর জমি নদীতে ভেঙে যায়। কিন্তু বিপরীতে এক হাজার ৫৬৮ হেক্টর জমি চর হিসেবে জেগে ওঠে।
গবেষকরা বলছেন, যদিও নতুন চর জাগার পরিমাণ বেড়েছে কিন্তু সে চর কোনোভাবে কাজে লাগছে না। যে কারণে ভূমি হিসেবে তা যোগ হলেও তার কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। বিপরীতে যেসব বসতি, স্কুল, কলেজ, অবকাঠামো নদীতে বিলীন হয়ে যায় তার বিপরীতে শুধু চরের জমির কোনো মূল্যই থাকে না।
পদ্মার গতিপথ পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এসএম আবু হোরায়রা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার জানা মতে, গত তিন বছর আমাদের ইনস্টিটিউট থেকে কোনো গবেষণা করা হয়নি। আমাদের হাইড্রোলজি বিভাগের যারা আছেন, তারা যদি সরকার থেকে ফান্ড পান, তাহলে অবশ্যই গবেষণা করবেন।’