জেট এ-১ (এভিয়েশন) ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে দেশে প্রথমবারের মতো গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (২৩ মার্চ) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব গ্রহণ করবেন তারা।
নতুন উদ্যোগের বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রথমবারের মতো তরল জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা নতুন উদ্যোগ। একটি বিষয় উঠে এসেছে যে জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমানো যায়, তা হলে কমানো হচ্ছে না কেন? একদিক দিয়ে এটা সত্য যে দাম কমানো সম্ভব যদি ট্যাক্স-ভ্যাট বাদ দিয়ে দেয়া হয়। যেটা সরকার পেয়ে থাকে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য কমানোর প্রবিধানের কাজ ২০১২ সাল থেকেই চলছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালেও তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অনুমোদন পেয়ে গেলে আইনগতভাবে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। তবে বিইআরসির সক্ষমতা ও সামর্থ্য বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিইআরসির ওপর যে দায়িত্ব, তা সঠিকভাবে পালন করতে হবে।
শুনানির বিষয়ে জালাল আহমেদ বলেন, এ ধরনের শুনানির সুবিধা হলো উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা যায়। ভোক্তার বক্তব্য এবং লাইলেন্সধারীর বক্তব্য শুনতে পারি। কখনো কখনো কোনো পক্ষের বক্তব্য রূঢ় হতে পারে। সে রূঢ় কথা শোনার জন্যও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। সবাই মিলেমিশে কাজ করলে আশা করি এসব অবস্থার উন্নতি হবে।
শুনানিতে অংশ নিয়ে বেসরকারি বিমান সংস্থা নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, আমরা পদ্মা ও বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) মনোপলির শিকার। এখানে অভ্যন্তরীণ বিমানের জন্য জ্বালানির মূল্য মনমতো নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জেট ফুয়েলের মূল্য ৮৭ টাকা থেকে এক লাফে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলেও দেখছি, এখানকার বাজারে ১ বা দুই টাকা হেরফের হচ্ছে। এর মাধ্যমে পদ্মা অয়েলের অতিমুনাফা করার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। তাদের কাছ থেকে আমরা অতি উচ্চমূল্যে জেট ফুয়েল কিনতে বাধ্য হচ্ছি। এ অতি মূল্যের কারণে অভ্যন্তরীণ বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির যে দাম তার চেয়ে বেশি দামে দেশে বিক্রি হচ্ছে। এরপর ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের দ্বিগুণ দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকে। এ থেকে উত্তরণ চান বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মো. হাবিবুর রহমান আকন্দ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি ছিল ৯৫ সেন্ট, তখন আমাদের লোকাল মার্কেটে ছিল ১১১ টাকা। সেটি কমে যখন ৭৫ সেন্টে আসছে, তখনো ১১১ টাকাই ছিল। ভারত প্লাটস রেটের কাছাকাছি জ্বালানি সরবরাহ করছে। তারা কীভাবে করছে? পারটেক্স পেট্রো ও ইস্টার্ন রিফাইনারি জেট ফুয়েল তৈরি করতে পারে। কিন্তু তারা নাকি মাত্র ৫০ পয়সা মার্জিন পায়। সেজন্য তারা বানাচ্ছে না। এত কম মার্জিনে তারা কেন বানাবে? তাদেরকে কেন কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আমরা আমদানিনির্ভর থাকছি কেন?
এ সময় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, আমরা স্টেকহোল্ডার। আপনারা যখন বাড়িয়ে মূল্য নির্ধারণ করে দেন, তখন আমাদের শরীরে সুঁচের মতো বিঁধে। কারণ, আমার পকেট থেকে টাকা যায়। আপনারা কী এমন করেন যে জ্বালানি চুরি বন্ধ হয় না? আমরা চাই চুরি বন্ধ হোক। গ্যাসে চুরি বন্ধ হয়নি, বিদ্যুতে হয়নি, আপনারটা (জেট ফুয়েলে) বন্ধ হবে তার গ্যারান্টি কী? বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে কমে না কেন, এটি বিইআরসি খতিয়ে দেখুক।
তিনি বলেন, ডিজেল, পেট্রোলসহ যে চারটি জ্বালানি সরকার কাছে রেখে দিয়েছে আমরা চাই অনতিবিলম্বে সেগুলো বাইরে দিয়ে দেয়া হোক। কেন দিতে হবে এর জবাব দিয়ে তিনি বলেন, এখানে যতটুকু তথ্য দেখানো হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে জ্বালানির সঙ্গে সাড়ে ৫ টাকা করে অযৌক্তিক ব্যয় সংযোজিত হয়ে আছে। আপনারা দেখিয়েছেন, দাম ১১২ টাকা কিন্তু হিসাবে দেখা যাচ্ছে এখান থেকে ৪-৫ টাকা কম হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে অযৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় ও বিইআরসির মাধ্যমে মূল্য বাড়িয়ে ঘাটতি কমানো লাগবে না। জেট ফুয়েলের অতিরিক্ত সাড়ে ৫ টাকা যদি বাঁচানো যায়, তাহলে বছরে তিনশ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। আর পুরনো কাঠামাতেই প্রতিবছর জ্বালানি খাতে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সরকারকে বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়ে জ্বালানির জন্য রিভিউ কমিশন গঠনের বিষয়টি নজরে আনার চেষ্টা করেছি। যেটি বিইআরসির অধীনেই থাকবে। জ্বালানির খবচ রিভিউ করলে বছরে গ্যাসে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বিদ্যুতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে। তেলের হিসাব আমরা সঠিক জানি না। জ্বালানির দাম শুধু ডলারের মূল্য বাড়ার ফলে হয়নি। অনেকক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। সরবরাহ খরচ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। কাজেই এসব রিভিউ করলে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
এ সময় বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বিইআরসিকে বলেন, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে একমাত্র পদ্মা অয়েল কোম্পানি জ্বালানি সরবরাহ করে। এটি অন্যদের জন্যও উন্মুক্ত করে দেয়া হোক। ভোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে বেশি সুবিধা পাবে সেখান থেকে জ্বালানি নেবে। একটি প্রতিষ্ঠান থাকায় সবাই পদ্মার কাছে জ্বালানি নিতে বাধ্য। এ অবস্থার পরিবর্তন চান তারা।
বিমান সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা আরো বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো বাইরে থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে যাতে দেশের বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে না হয়।
শুনানিতে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, মিজানুর রহমান, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার ও ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া উপস্থিত ছিলেন।
গণশুনানিতে বিভিন্ন এভিয়েশন সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি অংশ নেন।