দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী। জাপানের আর্থিক সহায়তায় এরই মধ্যে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। তবে বন্দর থেকে মূল সড়কে যাওয়ার ২৭ কিলোমিটারের সংযোগ পথটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ পথের কয়েক কিলোমিটার সংরক্ষিত বনের মধ্যে পড়ায় আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ। এক্ষেত্রে নকশা পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করছে না সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ।
দেশের প্রধান তিনটি ম্যানগ্রোভ বনের একটি চকরিয়া সুন্দরবন যা চিংড়ি ঘের, লবণচাষের মাঠ, ইটভাটা, অপরিকল্পিত বসতি ও দখল-দূষণের কারণে প্রায় বিলুপ্ত। উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষায় এ বনের গুরুত্ব বিবেচনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বন পুনঃস্থাপনে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বন বিভাগ কয়েকটি স্টাডিও পরিচালনা করেছে। তবে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ফলে সংযোগ সড়কের একটি অংশ নকশা করা হয়েছে এ বনভূমির ভেতর দিয়ে। এর ফলে বিলুপ্তপ্রায় এ ম্যানগ্রোভ বন পুনর্গঠন আরো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক নির্মাণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিনটি রেঞ্জ মিলিয়ে মোট ২৯ দশমিক ৮৭৪ একর বনভূমি ব্যবহার করবে সওজ বিভাগ।
এর মধ্যে মহেশখালীর উপকূলীয় বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জের কালীগঞ্জ মৌজায় ১ দশমিক ৮৭ একর ও চকরিয়ার পালাকাটা মৌজায় ফাসিয়াখালী রেঞ্জের দশমিক শূন্য ৫ একর জমি রয়েছে। তবে প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি—২৭ দশমিক ৯৫৪ একর বনভূমি ব্যবহার হবে চকরিয়ার রামপুর মৌজার সুন্দরবন এলাকার। বিলুপ্তপ্রায় এ ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারে বন বিভাগ নকশা পরিবর্তনের সুপারিশ করলেও অধিকাংশ ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় সংরক্ষিত বনভূমির মধ্য দিয়েই সড়ক নির্মাণ এগোচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের সড়ক নির্মাণ অংশের প্রকল্প ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন বিভাগের আপত্তি থাকলেও প্রকল্পের সিংহভাগ জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়ে গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তনের সুযোগ নেই।’
বন বিভাগের আপত্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে চকরিয়া সুন্দরবনসহ অন্যান্য সংরক্ষিত বনের ওপর নির্মিত সড়কটি এলিভেটেড করা হবে বলে জানান তিনি। প্রকল্প ম্যানেজার বলেন, ‘মূলত চকরিয়া সুন্দরবনসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাটি নরম হওয়ায় এলিভেটেড পদ্ধতি ছাড়া সড়ক নির্মাণ না করেও উপায় নেই। বন বিভাগ এ অংশটি অধিগ্রহণে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মাঠ পর্যায় থেকে মতামত চাওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই সড়ক নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন হবে।’
বন বিভাগ বলছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বা বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য ১৩ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি কার্যক্রম গ্রহণ এখন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার। এজন্য বনভূমিতে সড়ক নির্মাণ না করে বিকল্প অ্যালাইনমেন্টে নির্মাণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কাছাকাছি মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে চলাচলের জন্য নির্মিত সড়কটির অ্যালাইনমেন্ট বিবেচনায় নেয়ার পরামর্শও দেয়া হয় তাদের পক্ষ থেকে। উপকূলীয় বন বিভাগ, কক্সবাজারের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায় থেকে বন বাদ দিয়ে সড়ক নির্মাণের অনুরোধ করেছি। তবে একান্তই এড়ানো না গেলে এলিভেটেড আকারে সড়ক নির্মাণের পক্ষে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। এজন্য সব মিলিয়ে ৩০ একর সংরক্ষিত বনভূমি রি-রিজার্ভ করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে উপকূলীয় বন বিভাগ সে অনুযায়ী সওজের সঙ্গে আলোচনা করবে।’
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনভূমির ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করতে হলে চট্টগ্রাম অংশের ১ দশমিক ৮৭০ একর জমিকে ‘বন আইন-১৯২৭’-এর ২৭ নম্বর ধারায় ‘বন আর সংরক্ষিত নহে’ (ডি-রিজার্ভ) ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করতে হবে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের দাবি, এ বনভূমির পাশঘেঁষে কুহেলিয়া নদীর তীরে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে। সড়ক নির্মাণে বন ও এর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সড়কটি এলিভেটেড আকারে নির্মাণ করে নিচে গাছ লাগানোর মাধ্যমে অবশিষ্ট বন রক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ জানায়, প্রস্তাবিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে এ বনভূমি তার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হারাবে, বিশেষত চকরিয়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
চকরিয়া সুন্দরবন একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনগুলোর একটি ছিল যা অনিয়ম, দখল ও নির্বিচার বন্দোবস্তে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া এ বন পুনরুদ্ধারে বন বিভাগ নতুন করে বনসৃজন, বন্দোবস্ত দেয়া জমি পুনরায় অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এখন এ বনের ওপর দিয়ে ভারী অবকাঠামো, বিশেষ করে সড়ক নির্মিত হলে বনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।