সিরাজগঞ্জ শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে কাটাখালী খাল, যা এক সময় বড়াল নদ নামে পরিচিত ছিল। ১৮০৩ সালে পাট ব্যবসার জন্য ব্রিটিশ নীলকুঠিয়ালরা খালটি পুনরায় কেটে সচল করে। তখন থেকেই এটি কাটাখালী খাল নামে পরিচিত। সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য খালটি খনন করা হয়। যমুনা নদীর সঙ্গে সংযোগ করা হলে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ছিল খালটিতে। ১৯৬২ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ফলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয় এবং পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে বিভিন্ন সময় খনন করা হয়েছে খালটি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খালটি পুনঃখননের কাজ শুরু করে। প্রায় ২২ কিলোমিটার খনন করা হলেও খালে ফেরেনি স্বচ্ছ পানির প্রবাহ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খালটি যথাযথভাবে খনন করা হয়নি। নিয়ম না মেনে অনভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে করানো হয় খননকাজ। যেনতেনভাবে খননের কারণে খালটি আগের মতোই রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বড়াল নদের উৎপত্তি রাজশাহীর চারঘাট থেকে পদ্মার শাখানদী হিসেবে। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে নদটি। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও পাবনার বেড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হুরাসাগরে মিলিত হয়ে যমুনা নদীতে পড়েছে বড়াল। এক সময় এ নদে বড় বড় জাহাজ চলাচল করত। দীর্ঘদিন সংস্কার না করা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ১৯৬২ সালে বাঐতারা প্রান্তের স্লুইস গেটের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বড়াল বা কাটাখালীর পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে ধীরে ধীরে এটি সরু খালে পরিণত হয়। বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধিরা সংস্কারের কথা বললেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এর মধ্যে দফায় দফায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটা সফলতার মুখ দেখেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের শেষদিকে সিরাজগঞ্জ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ খাল খনন, দুই পাড়ে রাস্তা নির্মাণ, আলোকসজ্জার জন্য দুই পাড়ে আধুনিক সড়কবাতি স্থাপনসহ সাড়ে ২২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এজন্য খালের ওপর নির্মাণ করা হয় তিনটি আর্চ ব্রিজ। পৌরসভার কাজ চলমান থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় খলটির খননকাজ শুরু করে। পানিপ্রবাহ ঠিক রেখে খালটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে খননকাজ শুরু করা হয়। যমুনা নদীর উৎসমুখ সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাঐতারা থেকে শহরের মিরপুর, বাজার স্টেশন, রেলওয়ে কলোনি হয়ে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের পাশ দিয়ে জানপুর, বাহিরগোলা এবং চন্দ্রকোনা হয়ে কালিঞ্জার ভেতর দিয়ে ইছামতী নদী পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাটাখালীর মূল কাজ পৌরসভার মাধ্যমে করা উচিত। তবে আমাদের সহযোগিতা নিতে পারে পৌরসভা। খনন করার কারণে ময়লা-আর্বজনা পরিষ্কার হয়ে কাটাখালীতে অনেকটা পানিপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে আমরা সেটা ধরে রাখতে পারিনি। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় না করে খনন বা সংস্কার করার কারণে কোটি কোটি টাকার কাজ মূলত দৃশ্যমান হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘শহরের পানি ড্রেন দিয়ে কাটাখালীতে পড়ছে। সব ধরনের আবর্জনা কাটাখালীতে ফেলার কারণে আবারো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। চার বছর আগে খনন করা কাটাখালী আবারো ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। শহরের সব পানি নিষ্কাশনের জন্য কাটাখালীর দুই পাশে উপযুক্ত ড্রেন নির্মাণ করা প্রয়োজন। যেন শহরের পানি কাটাখালীতে ফেলা না হয়। কাটাখালীতে কোনো ধরনের আবর্জনা ফেলা যাবে না। এ কাজগুলো যদি আমরা না করি তবে কাটাখালীর অবস্থা উন্নত করা সম্ভব।’
পৌরসভার বাসিন্দারা বলছেন, কাটাখালীকে ঘিরে শহরবাসীকে স্বপ্ন দেখানো হয়। খালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়া হবে। যাতে করে স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত হয়। খালের দুই পাড়ের আবর্জনা পরিষ্কার হয়ে চলে যাবে যমুনায়। কাটাখালীতে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি হবে, নৌকা চলবে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অভিজ্ঞ ঠিকাদার নিয়োগ না দেয়ায় খাল খননের প্রথম পর্যায়ে কাজের গতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের পাশে খালে বসানো ব্লক ধসে যায়। কাজ চলতে থাকে ধীরগতিতে। কিছুটা খনন করে শেষ করা হয় প্রকল্পের কাজ। খাল যেমন ছিল ঠিক তেমনটাই রয়ে গেছে। পানিপ্রবাহ নেই, আবারো আবর্জনায় ভরে গেছে।
তারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর কাটাখালী খাল খনন শুরু হলে মনে করেছিলাম আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবে। কাটাখালী তার যৌবন ফিরে পাবে। খালের পানি স্বচ্ছভাবে প্রবাহিত হয়ে নদীতে পড়বে। কাটাখালী বিনোদন কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তবে খননের নামে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তারা।