চলনবিলে নেমে যাচ্ছে বন্যার পানি। মাছ খাওয়ার লোভে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে দেশীয় প্রজাতির বক। এ সুযোগে বক শিকারে মেতে উঠেছে শিকারিরা। রাতের আঁধারে ছোট ছোট ফাঁদ বানিয়ে শিকার করছে এসব পাখি। বিভিন্ন সময় পরিবেশকর্মীরা অভিযান পরিচালনা করলেও তত্পরতা কমছে না পাখি শিকারিদের।
পরিবেশকর্মীদের তথ্য বলছে, ১৫ দিনে চলনবিলের সিংড়া ও গুরুদাসপুরে অন্তত ৯০০ বক শিকার করা হয়েছে। এসব বক শিকারিদের কাছ থেকে উদ্ধার করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ধ্বংস করা হয়েছে শিকারিদের ফাঁদ। তবে শিকারিদের জরিমানা বা মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হলেও বন্ধ হচ্ছে না পাখি শিকার।
প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ সচেতন না হওয়ার কারণে পাখি শিকার বন্ধ হচ্ছে না। তবে এখনই চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধ করা না গেলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন এ অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র।
চলতি মাসে চলনবিলে বক শিকারের মহোৎসব চলছে। ১০ অক্টোবর কয়েকজন অসাধু ব্যক্তি উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়ন থেকে ট্রাকে করে প্রায় ৭০০টি বক, ঘুঘু ও পানি হাঁস ঢাকায় বিক্রির উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছিল। পরে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আতিয়ার রহমান বাঁধনকে খবর দেয়া হলে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পাখিগুলোকে ১০টি বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার করেন। উদ্ধারের পর পাখিগুলো অবমুক্ত করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে ট্রাকের মালিককে পাওয়া যায়নি।
সবশেষে গতকাল পরিবেশকর্মী সাইফুল ইসলাম ও হাসান ইমামের নেতৃত্বে বিয়াস ও ঠেঙ্গাপাকুরিয়া বিলে অভিযানে যান চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা। তারা ধানক্ষেত থেকে পাখিসহ তিন শিকারিকে আটক করে বিয়াস বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করেন। পরে সিংড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রকিবুল হাসান তিন শিকারিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে প্রত্যেককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। উদ্ধারকৃত পাখিগুলো সকাল সাড়ে ১০টায় চলনবিল গেট এলাকার একটি পাখি কলোনিতে অবমুক্ত করা হয়।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্ষার শেষভাগে চলনবিলে মাছের সঙ্গে পাখির আনাগোনা বেড়ে গেছে। আর সেই সঙ্গে কিছু লোভী পাখি শিকারি বিলের ধানক্ষেতে কলা-খেজুরপাতা দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি কিল্লায় শত শত পাখি শিকারে মেতে উঠেছে। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান, প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ করছি, কিন্তু তাতেও থামছে না পাখি শিকার। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরো কঠোর প্রদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
১০ অক্টোবর জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। এ সময় নাটোরের জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য পাখি শিকার বন্ধ করতেই হবে। আমরা খবর পাওয়ার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে পাখি শিকারিদের শাস্তি দিয়েছি। সিংড়া ও গুরুদাসপুরে পাখি শিকার বন্ধে মাইকিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ মোল্ল্যা রেজাউল করিম বলেন, একটা এলাকার ইকোসিস্টেমকে (বাস্তুতন্ত্র) ঠিক রাখার জন্য পাখি ও বন্যপ্রাণী গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা ইদানীং লক্ষ করছি, চলনবিলে দেশীয় প্রজাতির বক শিকার করা হচ্ছে, যা চলনবিল অঞ্চলের জন্য হুমকি। একটা এলাকার ইকোসিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্য এখনই চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধ করতে হবে। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন তেমন ভূমিকা পালন করছে না।