দেশের যেসব জেলায় তামাক চাষ বেশি হয় তার মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যতম। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও অধিক লাভের আশায় তামাক চাষ করছেন কৃষক। এজন্য তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহারের কারণে মুখে ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপে ব্রেন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরশক্তি। এটি জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জেলার ছয়টি উপজেলাতেই তামাক চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলায়। মিরপুরে মোট কৃষিজমি রয়েছে ২৩ হাজার ১১১ হেক্টর, ভেড়ামারায় ১০ হাজার ৮৯১ ও দৌলতপুরে ৩২ হাজার ৪৪৮ হেক্টর। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এর মধ্যে দৌলতপুরে ৩ হাজার ৬৮৫ হেক্টর, ভেড়ামারায় ৮৩০ ও মিরপুরে ৬ হাজার ৮৫১ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। অবশ্য গত বছর জেলায় তামাক চাষ হয়েছিল ১০ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে। সে হিসাবে এবার ৪৫৪ হেক্টর জমিতে তামাক আবাদ বেড়েছে। এর মধ্যে শুধু দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুরেই আবাদ হয় ১০ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে।
মিরপুর উপজেলার বলিদাপাড়া এলাকার তামাকচাষী মাহমুদুল হক জানান, তামাক চাষে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ বেশি হয়। এজন্য তিনি তামাক আবাদ করেন। প্রতি বিঘা জমিতে তামাক চাষে খরচ হয় ৪০-৪৫ হাজার টাকা। বিক্রি হয় ৮০-৯০ হাজার টাকা।
দৌলতপুর উপজেলার হারুনুর রশীদ আসকার জানান, তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ব্যবহার করার ফলে ভালো ফলন হয়। তবে সার তাদের কিনতে হয় না। বিভিন্ন কোম্পানি চাষীদের সহায়তা করে। তামাক বিক্রির ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। কোম্পানিগুলো তামাক কিনে নেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, তামাক উৎপাদনের আগে কোম্পানিগুলোর দর নির্ধারণ, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শের কারণে তামাক চাষ বাড়ছে।
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইনের ১২ ধারায় তামাকজাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা গ্রহণ করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তামাক চাষের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।’
সম্প্রতি দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে তামাকখেত। এসব অঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো তামাক চাষে তাদের অগ্রিম ঋণ দেয়। ঋণ সুদমুক্ত তবে এটি বাই-ব্যাক পদ্ধতি। ঋণের শর্ত হলো ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেই তামাক বিক্রি করতে হবে। কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বিনামূল্যে সার ও বীজ সরবরাহ করা হয়। চাষের শুরু থেকেই কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাদের সহায়তা করেন। সার-বীজ থেকে শুরু করে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। ভালো দামের নিশ্চয়তাও দেয়া হয়। তাছাড়া তামাক চাষ কোনো কৃষক বেশি করতে চাইলে তাদের আলাদা টার্গেট দেয়া হয়। এজন্য আলাদাভাবে কার্ড তৈরি করে দেয়া হয়। তামাক চাষে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তবে ক্ষতিকর দিকটি বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন গৌতম কুমার রায়। তিনি বলেন, ‘তামাক চাষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা হচ্ছে, তবে জোরালো নয়। কুষ্টিয়া রিজিয়নে খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে—সেটা আলোচনায় উঠে আসছে না।’
এক একর জমির তামাক জ্বালাতে ভাটিঘরে ৫ টন জ্বালানির প্রয়োজন হয়। পুরোটাই মেটানো হয় বৃক্ষ থেকে। কুষ্টিয়াতেই প্রতি বছর কমপক্ষে হাজারেরও বেশি এ ধরনের ভাটি তৈরি হয়। তামাক জ্বালানোর সময় যে ধোঁয়া বের হয়, তাতে নিকোটিন ও কেমিক্যাল টেস্টিসাইড ড্রকিসহ বিভিন্ন উপাদান থাকে। পরে তা বাতাসে মিশে যায়। একইভাবে তামাক গাছ বড় করা পর্যন্ত যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, বৃষ্টির সময় এসব জমির পানি নদীতে চলে যায়। এতে জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়। তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে কাজ করছে কুষ্টিয়ার স্থানীয় একটি এনজিও দিশা।
এ ব্যাপারে দিশার নির্বাহী পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরপুর উপজেলায় প্রায় ১১০০ কৃষককে তামাক চাষ থেকে ফিরিয়ে হয়েছে। আগে তারা তামাক আবাদ করতেন। এখন শীতকালীন সবজির পাশাপাশি বিভিন্ন ফল ও সরিষা আবাদ করছেন। যেসব কৃষক তামাক আবাদ ছাড়তে চান তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া, সার, বীজ ও বালাইনাশক দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’