বিশ্বাসে চিড়

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে

বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিংয়ের সর্বজনস্বীকৃত মূলমন্ত্র হলো ‘বিশ্বাস’। আমানতকারী বিশ্বাস করেন, ব্যাংকে তার অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং প্রয়োজন হলে তিনি তা ফেরত পাবেন।

গ্রাহকের এ আস্থার ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে গোটা বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। যদিও বাংলাদেশে তা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিপর্যয় ব্যাংক খাতের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

গত কয়েক বছরে অনেক বিতর্কিত ঘটনা, অনিয়ম ও বিপর্যয় দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সংকোচনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চার বছর আগেও দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ২৭ শতাংশ ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ অংশীদারত্ব কমতে কমতে চলতি বছরের মার্চে ২৩ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। আর রেমিট্যান্স সংগ্রহসহ বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশীদারত্ব আরো গুরুতর মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসত শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। কিন্তু এ অংশীদারত্ব এখন মাত্র ২০ শতাংশে নেমেছে। বিপরীতে এ ব্যবস্থার ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের স্থিতি ও হার।

চলতি বছরে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের স্থিতিও কমতে শুরু করেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত ছিল ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৯২ কোটি টাকা।

তিন মাস পর, চলতি বছরের মার্চে আমানতের এ স্থিতি ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। যদিও আশির দশকে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং চালু হওয়ার পর থেকে এতদিন আমানত স্থিতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছিল। পাশাপাশি বিস্তৃত হয়েছিল এ ধারার ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্যও।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটি সহসা কাটিয়ে ওঠা কঠিন। এ ধারার বেশির ভাগ ব্যাংকই এখন দেউলিয়াত্বের মুখে রয়েছে। এসব ব্যাংকের অনেক গ্রাহক এখন নিরাপদ বিনিয়োগের স্থান বা অর্থ জমা রাখার উৎস খুঁজছেন। ইসলামের অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলা গ্রাহক সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যাবেন না। এ পরিস্থিতিতে অনেকে ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়লে সেটি দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

অনেক গ্রাহক যে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের উৎস খুঁজছে, সেটির বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুকুকের নিলামে। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো স্বল্পমেয়াদি (২৭৩ দিন) ইজারা সুকুক বন্ডের নিলাম আয়োজন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই নিলামে লক্ষ্যমাত্রার ১০ গুণের বেশি বিড জমা পড়ে। ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সুকুক কেনার আবেদন পড়েছিল ৫৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার।

সুকুকের প্রতি এ আকর্ষণকে শরিয়াহভিত্তিক ফাইন্যান্স ব্যবস্থায় মানুষের আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ সেটি কিনছে না। কিন্তু সুকুক কেনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তার মানে দেশের মানুষের বড় একটি অংশ শরিয়াহভিত্তিক ফাইন্যান্স ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল। এখানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিপুল ভোক্তা আছে। ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার কারণে তারা আস্থাহীনতার মধ্যে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হবে দ্রুত ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। অন্যথায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের গ্রাহকরা ব্যাংকিং ব্যবস্থাবিমুখ হয়ে যাবে। সেটি দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক ব্যবস্থার জন্য আরো বড় বিপদ ডেকে আনবে।’

বিশ্বে ইসলামী ব্যাংকিং ধারণাটির বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছিল আরব রাষ্ট্র মিসরে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দেশটিতে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলোর অর্থায়নে মিসরে বিকাশ ঘটেছিল বিশেষ পুঁজিপতি শ্রেণীর। আর তাদের বিনিয়োগেই দেশটিতে শিল্প খাতের ভিত গড়ে ওঠে।

সত্তর ও আশির দশকে ইসলামী ব্যাংকিং ছড়িয়ে পড়ে পুরো মুসলিম বিশ্বে। বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালে চালু হয় ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির হাত ধরে দেশে গড়ে উঠেছিল কয়েক লাখ নতুন উদ্যোক্তা। একেবারে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরুর পর এ উদ্যোক্তাদের অনেকে দেশের কনগ্লোমারেটে রূপান্তর হয়েছিল। কিন্তু অতীতের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকটি।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মতো নানামুখী সংকটে আছে শরিয়াহভিত্তিক প্রায় সব ব্যাংক। সুশাসনের বড় ঘাটতি, বেনামি ঋণ ও অনিয়ম-দুর্নীতিতে এ ব্যবস্থার অন্তত সাতটি ব্যাংক বিপর্যয়ে পড়েছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়ে এ ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধারকৃত অর্থে চলছে। ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ (বিনিয়োগ) বিতরণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে থেমে গেছে নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তোলার যাবতীয় প্রক্রিয়াও।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর পতন দেশজ পুঁজি বিকাশে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। অতীতে এসব ব্যাংকের অর্থায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেগুলো এখন আর চলতি মূলধন পাচ্ছে না। দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়ের অর্থ না পাওয়ায় অনেক শিল্প-কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। আর নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো অর্থও শরিয়াহভিত্তিক বেশির ভাগ ব্যাংকের হাতে নেই।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ছাড়াও দেশের শরিয়াহভিত্তিক অন্য ব্যাংকগুলো হলো আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), এক্সিম ব্যাংক, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকই ছিল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল কেবল শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শরিয়াহভিত্তিক আটটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ইসলামী ধারার ব্যাংকিংয়ে জমাকৃত আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, যা দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই সময়ে এ ধারার ব্যাংকিংয়ে বিনিয়োগের (ঋণ) পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা দেশের ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর আমানত স্থিতির চেয়ে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি অনেক বেশি। মূলত গত তিন বছর শরিয়াহভিত্তিক বেশির ভাগ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ রয়েছে। কিন্তু বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশই খেলাপি হওয়ায় কোনো আদায় নেই। অনাদায়ী সুদ বা মুনাফা যুক্ত হয়ে ঋণের স্থিতি ক্রমাগত বাড়ছে। বিপরীতে এ শ্রেণীর ব্যাংকগুলো থেকে মানুষ আমানত তুলে নিচ্ছে। যদিও বেশির ভাগ ব্যাংকই গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পর্ষদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এ তিনটি ব্যাংকের মোট বিনিয়োগকৃত অর্থের ৮০ শতাংশের বেশি গ্রুপটি নিয়ে গেছে। বেনামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এসব ঋণ বের করা হয়েছে বলে বিশেষ নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। ২০১৬ সাল-পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণে নেয় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের। এর মধ্যে কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এস আলম গ্রুপ বের করে নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। আর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রুপটি বের করেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। এখনো কার্যক্রম শুরু করতে না পারা এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৮৪ শতাংশেরও বেশি এখন খেলাপি। মূলত অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের শিকার শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের যাবতীয় দায় এ ব্যাংকের ওপর পড়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। তবে সম্প্রতি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিয়োগ ও পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ অস্থিরতার জেরে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি আমানত বের হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে লেনদেন স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে দেশের বৃহত্তম ব্যাংকটি।

অবশ্য ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলতাফ হোসেন বলছেন, ‘আমাদের ব্যাংকের লেনদেন এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গত এক সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই আমরা লেনদেন করতে পেরেছি। অনেক আমানতকারী তুলে নেয়া অর্থ নতুন করে এসে জমা করছেন। এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে সামগ্রিকভাবে পুরো ইসলামী ধারার ব্যাংকিংই ঘুরে দাঁড়াবে।’

ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম নিয়ে প্রতি ত্রৈমাসিকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘কোয়ার্টারলি রিপোর্ট অন ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের চলতি বছরের মার্চ সংখ্যা গতকাল প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধারার ব্যাংকের ১ হাজার ৭০০ শাখা রয়েছে। এর বাইরে ১৭টি প্রচলিত ধারার ব্যাংক চালু করেছে আরো ৪৯টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা। আর ২১টি ব্যাংক ৯৭৬টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকসহ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি থেকে বের হয়ে যাওয়া আমানতের একটি অংশ সাধারণ ধারার ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো ও শাখায় জমা হয়েছে। তবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এ শ্রেণীর শাখাগুলোর আমানত স্থিতিও কমেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ও ইসলামিক ফাইন্যান্স নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক এম কবির হাসান। এ গবেষক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃতি হয়েছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে। সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো পরিবর্তিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক হয়েছিল। কিন্তু সে পরিবর্তনটি ঘটেছিল কেবল নামেই। উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ শরিয়াহ কথাটিকে লুটপাটের জন্যও ব্যবহার করেছে।’

দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করেন এম কবির হাসান। তিনি বলেন, ‘দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে থাকতে চান। এ খাতের ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে রেখে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধারণা করছি, এ খাতের ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’

সুশাসনের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে বড় ধাক্কা খেলেও বিশ্বব্যাপী এখনো একটি বিকাশমান ধারা হলো ইসলামী ব্যাংকিং। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ (আইডিবি) বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে বার্ষিক ১৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার। ২০২২ সাল শেষে বৈশ্বিক ইসলামিক ফাইন্যান্সে সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আর সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন হচ্ছে ২০২৮ সালে এ সম্পদের আকার ৭ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যে শুধু ইসলামী ব্যাংক খাতের সম্পদই ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাজ্য, চীন, হংকংয়ের মতো অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর বাজারে ইসলামিক ফাইন্যান্সের বিভিন্ন প্রডাক্ট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর থাইল্যান্ড, শ্রীলংকার মতো দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক আইনও চালু হয়েছে।

দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাসাধ্য চেষ্টা করছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকটি যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে পারে, সে চেষ্টা চলছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আশা করছি, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি গ্রাহকদের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে।’

আরও