প্রায় ৭০০ একর আয়তনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্ধেকেরও বেশি জায়গা লেক, গাছপালা ও সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক স্থাপনা ও দোকানপাট এখন নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দোকানের সংখ্যা ৩৭৩। এত পরিমাণ দোকানের ফলে একদিকে পরিবেশ দূষণ ও স্থান সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। এখন পর্যন্ত দোকানগুলোর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট পাওনা ১ কোটি ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮১ টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে দোকান স্থাপনের অনুমোদন ও ভাড়া উত্তোলনের দায়িত্ব এস্টেট শাখার। এস্টেট শাখার তথ্যানুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি গেট, বিশমাইল গেট ও প্রান্তিক গেটসহ অভ্যন্তরীণ এলাকায় মোট ১৯৯টি দোকান রয়েছে।
জাবির আটটি হলে ১৭৩টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানের অনুমোদন, ভাড়া উত্তোলন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হল কর্তৃপক্ষের হাতে।
সরজমিন পরিদর্শন ও এস্টেট অফিস-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অনেক দোকান বহু বছর আগে কর্মকর্তা-কর্মচারী বা রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। পরে এসব দোকান বেশি টাকার বিনিময়ে অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হালনাগাদ মালিকানার তথ্য নেই। ফলে প্রকৃত দোকানদার নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দোকান মালিকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে নিজ খরচে স্থাপনা গড়ে তুলেছেন এবং শুধু ভিটিভাড়া দিচ্ছেন। অনেকে আবার নিজের নামে দোকান বরাদ্দ নিয়ে সেটি বিক্রি করে দিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় অতীতে ছাত্রলীগের নেতারা অর্থ ভাগাভাগিতে যুক্ত ছিলেন বলেও জানা গেছে। ফলে একেক দোকানের কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বকেয়া জমে আছে। অনুমতি ছাড়া বেনামে দোকান গ্রহণের ঘটনাও ঘটছে, যেখানে কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরাও জড়িত। এসব বরাদ্দের ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রেই অবগত নয়।
এস্টেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১০ নম্বর হল এলাকায় প্রতি বর্গফুট মাটির ভাড়া ১ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হয়। ফলে ১ হাজার বর্গফুট দোকানের মাসিক ভাড়া মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা, যেখানে বাইরের বাজারমূল্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল গেট-সংলগ্ন নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ছয়টি দোকান থেকে সর্বোচ্চ ভাড়া আদায় করা হয় প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে। এই হারে সব দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় হলে বিশ্ববিদ্যালয় বছরে ২ কোটি টাকারও বেশি আয় করতে পারত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এত অপরিকল্পিত দোকান থাকা ঠিক নয়। এখানে একটি কমিটি ও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।’
এস্টেট অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল কাশেম বলেন, ‘এগুলো দীর্ঘদিনের জটিলতা। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বছরে প্রায় ৫১ লাখ টাকা আদায় করেছি। দোকানগুলোকে আমরা একটি সিস্টেমের মধ্যে আনতে চাই, তবে এজন্য সবার সহযোগিতা দরকার।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, ‘এ পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংকট তৈরি করেছে। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আমি দোকানগুলোয় তৎপরতা চালাচ্ছি। চার দফা নোটিস দেয়ার পরও বকেয়া আদায়ের হার খুবই কম। আমরা সব দোকানকে একটি কেন্দ্রীয় সিস্টেম ও গাইডলাইনের আওতায় আনতে চাই।’