বন্দরে পণ্য ক্ষতির দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত চান ব্যবসায়ীরা

টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহন কার্যক্রমে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সমন্বিত আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা, বন্দরে আটকে থাকা পণ্যের বিভিন্ন চার্জ মওকুফ এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠনেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

গতকাল নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে এসব দাবি জানানো হয়।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন দ্য চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

চিঠিতে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, বর্তমান সরকারের ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির ধারাবাহিকতায় চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দরে পণ্য খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমদানীকৃত তুলা, সুতা, কাপড়, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক, প্যাকেজিং সামগ্রী, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য আর্দ্রতা সংবেদনশীল পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তারা বলেন, ‘একই সঙ্গে রফতানির অপেক্ষায় থাকা তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন প্রস্তুত পণ্যের চালান বিলম্বিত হওয়ায় রফতানি আদেশ বাতিল, মূল্যছাড়, বিলম্বজনিত জরিমানা এবং ব্যয়বহুল বিমানপথে পণ্য পাঠানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দেশের রফতানি আয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৫ জুলাই থেকে টানা ভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড এবং বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে পানি প্রবেশ করে। এতে পণ্যভর্তি কনটেইনারসহ আমদানি ও রফতানি পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। ১০ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত যেকোনো দাবি অস্বীকার এবং এ বিষয়ে দায় গ্রহণ না করার অবস্থান জানায়।

এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্দরে থাকা মালপত্র, কার্গো ও কনটেইনারের যে ক্ষতি বা লোকসান হয়েছে বা হতে পারে, তা ‘অ্যাক্ট অব গড’ (দৈব দুর্বিপাক) হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণে আইনগতভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো দায় বহন করবে না। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দ্য রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চট্টগ্রাম পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার), ২০০১’-এর রেগুলেশন ১৯৯ (১৪) অনুযায়ী এ ধরনের ঘটনার দায় থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ অব্যাহতি পায়। ফলে এ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত পণ্য ক্ষতির জন্য যেকোনো পক্ষ বা উৎস থেকে উত্থাপিত ক্ষতিপূরণের দাবি বন্দর কর্তৃপক্ষ অস্বীকার, বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক সৃষ্ট কোনো কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই বলে কার্গো ও কনটেইনারের ক্ষতি বা লোকসানের দায় থেকে বন্দর অব্যাহতি পায়। কনটেইনার ইয়ার্ডে রাখাটা বিশ্বজুড়েই নিয়ম। বন্দরের ইয়ার্ডও উঁচু করেই বানানো।’

এ বিষয়ে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, এ ধরনের একতরফা অবস্থান ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রফতানিকারক এবং অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি যদি অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কিংবা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি ব্যবহারকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের মতে, দীর্ঘ সময় কনটেইনার ও পণ্য আটকে থাকায় আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের অতিরিক্ত ড্যামারেজ, ডিটেনশন, পোর্ট রেন্ট, শেড ও ইয়ার্ড চার্জ, স্টোরেজ ব্যয় এবং শিপিং চার্জ বহন করতে হচ্ছে। কাঁচামাল সরবরাহ ও রফতানি ব্যাহত হওয়ায় শিল্প-কারখানার উৎপাদন, নগদ অর্থপ্রবাহ, শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ, ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধেও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দর এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ড্যামারেজ, ডিটেনশন, স্টোরেজ ও অন্যান্য চার্জের চাপের মুখে পড়েছে। তাই এসব চার্জে যৌক্তিক ছাড় এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সমন্বিত আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।’

আরও