সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা নদীবেষ্টিত চরে কঠোর পরিশ্রম করে নানা ধরনের ফসল ফলাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছেন তারা।
জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে সদরের দুটি, কাজীপুরের ছয়টি, বেলকুচির তিনটি, শাহজাদপুরের
তিনটি এবং চৌহালী উপজেলার আট ইউনিয়ন যমুনাবেষ্টিত। এসব উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর চরভূমিতে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন চাষীরা। দেড় দশক আগেও যমুনা নদীর ভাঙন ও অতিবন্যা ছিল চরের মানুষের দুঃখের কারণ। নদীভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে শত শত কৃষক পরিবার নিঃস্ব হয়ে অসহায় জীবনযাপন করেছে।
সম্প্রতি নদী তীররক্ষা প্রকল্পের সুবিধা এবং যমুনা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় জেগে ওঠা বালুচর আবাদের আওতায় আসছে। একসময় বালুচরে ফসল ফলানো তো দূরের কথা, ঘাসও জন্মাত না। কালক্রমে বন্যায় পলিমাটি জমে উর্বর আবাদি জমিতে পরিণত হচ্ছে চর এলাকা।
উঁচু-নিচুভেদে প্রতি বছর তিন-ছয় মাস চরভূমি পানিতে ডুবে থাকার কারণে পলিমাটি সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে রাসায়নিক সার ছাড়াই সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়। এ সুবিধা পাওয়ায় গম, কাউন, ভুট্টা, বাদাম, মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, গাজর, মরিচ, হলুদ, শসা, শিম, কুমড়া, ধান, শাক-সবজিসহ কমপক্ষে ২০ ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে এ চরে।
চরের বেলে দো-আঁশ মাটিতে ডালজাতীয় ফসল মাষকলাই, মসুর, খেসারি ও ছোলাও প্রচুর আবাদ হচ্ছে। জেলায় উৎপাদিত গম, ভুট্টা, বাদাম, মরিচ ও সবজিসহ মোট উৎপাদনের সিংহভাগ এখন আবাদ হচ্ছে এ চরে। এমনকি ধান উৎপাদনের পরিমাণও কম নয়। যে কারণে চর এলাকার দিগন্তজুড়ে বিস্তীর্ণ বালুচরে এখন বেশির ভাগ সময় থাকছে শুধু সবুজের সমারোহ।
জীবিকার সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় যমুনার বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য ছোট-বড় চরে গড়ে উঠেছে জনবসতি। কৃষি ও পশুপালনই তাদের এখন প্রধান পেশা। যার প্রভাব পড়ছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায়। চরাঞ্চলের ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থা ধরে রাখতে ও সেখানকার মানুষের জীবযাত্রার মান আরো বৃদ্ধির জন্য চরকে ঘিরে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলছেন অভিজ্ঞরা।
কাজীপুর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের গটিয়ার চরের সফর আলী বলেন, চারবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখানে বসবাস করছি। চরের প্রায় তিন বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসল আবাদ করার পাশাপাশি গরু ও ছাগল পালন করছি। এখন অনেকটা ভালো আছি।
চৌহালী উপজেলার উমারপুর ইউনিয়নের মিনিদিয়াচরের কৃষক সামাদ মিয়া
জানান,
চর আমাদের অভাব ঘুচিয়ে দিয়েছে। এখানে খেতে পলিমাটি পড়ায় উর্বরতা বাড়ছে। ফসল আবাদে সার তেমন লাগে না। চর এখন আমাদের জীবন-জীবিকার প্রধান মাধ্যম।
কাজীপুর উপজেলার মেছড়া ইউনিয়নের গটিয়ার চরের এনজিও কর্মকর্তা আব্দুল বাসেদ বলেন, চরে এমন ফসলের আবাদ সম্ভব, ২৫ বছর আগেও চিন্তা করা যেত না। চরে আবাদযোগ্য ফসল ও চাষপদ্ধতি সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের আরো সচেতন করা হলে উৎপাদন বাড়বে।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট কৃষক রয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৬০০ জন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কৃষক চরাঞ্চলে কৃষি আবাদের সঙ্গে জড়িত। জেলার চরাঞ্চলে আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ৪২ হাজার ৭০০ হেক্টর। এর মধ্যে এখন ৩৮ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে নানা ধরনের ফসলের আবাদ হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সরকারি রাশিদাজ্জোহা মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের
সহযোগী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে
নিজেদের পুঁজি খাটিয়ে চরের জমি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলাচ্ছেন কৃষক। একই সঙ্গে গবাদি পশু পালন করছেন তারা। চরের উৎপাদন ব্যবস্থা মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে আবাদযোগ্য মোট জমির পরিমাণ নির্বাচন করে মাটির গুণাগুণ বিচার করতে হবে। চরমুখী জীবনযাপনে তাদের প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়, চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও থাকা জরুরি। উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে চরের কৃষকের মৌসুমি, বার্ষিক বা তার অধিক সময়ের জন্য প্রয়োজনমতো স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা ও যথাসাধ্য কৃষি প্রণোদনা দিতে হবে। এখানে পণ্য বিক্রির বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থাৎ চরের জমিকে পরিকল্পনামাফিক আবাদের আওতায় আনতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বাবলু কুমার সূত্রধর বলেন, জেলার ফসল উপাদনের বিশাল একটা অংশ এখন আবাদ হচ্ছে চরাঞ্চলে। বাদাম, মরিচ, ভুট্টাসহ কয়েকটি ফসলের প্রায় ৬০ ভাগ আবাদ হচ্ছে চরে। সেই চিন্তা থেকে চরে উন্নত জাতের ফসলের প্লট প্রদর্শনী করা হচ্ছে। কৃষককে বিভিন্ন ফসল এবং আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে বিভিন্ন ফসলের বীজ, সারসহ কৃষি প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে।