দেশের ৬২% মানুষ গ্রামে বাস করলেও ৭৫ শতাংশ চিকিৎসক সেবা দেন শহর এলাকায়

দেশের মোট চিকিৎসক-নার্সের তিন-চতুর্থাংশই শহর এলাকায় সেবা দেন। যদিও দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’-এ এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশের মোট চিকিৎসক-নার্সের তিন-চতুর্থাংশই শহর এলাকায় সেবা দেন। যদিও দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’-এ এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চিকিৎসকসহ প্রায় সব সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধেই প্রধান অভিযোগ, তারা গ্রামাঞ্চলে থাকতে চান না। তাই তাদের পছন্দের শীর্ষে ঢাকা ও তার আশপাশের জেলা শহর। তাই গ্রামাঞ্চলে বেশি মানুষ বাস করা সত্ত্বেও সেখানে চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি রয়েছে। সিংহভাগ উপজেলা কমপ্লেক্সগুলোয় চিকিৎসকের অনেক পদ শূন্য পড়ে আছে।

‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’-এ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করে। গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস ৬২ শতাংশ মানুষের। তবে মোট চিকিৎসকের ৭৫ শতাংশ শহরাঞ্চলে এবং ২৫ শতাংশ গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত। আর ডেন্টিস্টদের ৫৮ শতাংশ শহরাঞ্চলে ও ৪২ শতাংশ গ্রামে সেবা দেন। অন্যদিকে চিকিৎসকদের মতোই মোট নার্সের ৭৫ শতাংশ শহরে এবং ২৫ শতাংশ গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত। ‘বি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট ৬৯ শতাংশ শহরে ও ৩১ শতাংশ গ্রামে কাজ করেন। আর মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অর্ধেকের বেশি শহরে কর্মরত।

গ্রামাঞ্চলের রোগীদের অভিযোগ, জুনিয়র চিকিৎসকরা অনেক সময় সাধারণ চিকিৎসার জন্যও রোগীদের জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। তৃণমূলের অনেক স্থানে আবার কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। ফলে সদর হাসপাতালগুলোয় সবসময়ই ধারণক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে রোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে প্রায়ই চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীর মৃত্যুও হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে যে পরিমাণ চিকিৎসক দরকার, সে পরিমাণ পদই এখনো তৈরি হয়নি। অন্যদিকে যে পদগুলো রয়েছে, সেগুলোও অনেক ফাঁকা পড়ে আছে। চিকিৎসক ও নার্সদের অনেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টিং নিতে চান না। এর পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম চিকিৎসকরা উচ্চশিক্ষার সুবিধার্থে মেডিকেল কলেজগুলোর কাছাকাছি জায়গায় পোস্টিং নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকায় চিকিৎসকরা গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় পোস্টিং নিতে চান না। প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে দেশে মোট নিযুক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ২৫ হাজার ৯২৬। এছাড়া ডেন্টিস্ট ৮৭০, নার্স (ডিপ্লোমা ও বিএসসি) ৩৩ হাজার ৬১৬, মিডওয়াইফ (ধাত্রী) ২ হাজার ৫৪৯, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ৩ হাজার ৮৯২ এবং ফার্মাসিস্টের সংখ্যা ১ হাজার ৭৪৪। মোট চিকিৎসকের মধ্যে প্রাইমারি লেভেলে ১১ শতাংশ, সেকেন্ডারি লেভেলে ১৪ ও টারশিয়ারি লেভেলে ৭৫ শতাংশ কর্মরত রয়েছেন। ডেন্টিস্টদের মধ্যে প্রাইমারি লেভেলে ২৮ শতাংশ, সেকেন্ডারি লেভেলে ১৪ ও টারশিয়ারি লেভেলে ৫৮ শতাংশ কাজ করছেন। আর নার্সদের মধ্যে প্রাইমারি লেভেলে ৮ শতাংশ, সেকেন্ডারি লেভেলে ১৭ ও টারশিয়ারি লেভেলে ৭৫ শতাংশ নিযুক্ত আছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিভিল সার্জন জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় যে পরিমাণ চিকিৎসকের পদ থাকা দরকার, সেই পরিমাণ পদ এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। যে পদগুলো শূন্য রয়েছে সেগুলোয় নিয়োগ দেয়া জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আরো বেশি মনোযোগী হওয়া জরুরি।

খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। মূলত গ্রামের মানুষ এখান থেকে সেবা পান। এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর অধীনে পরিবার-পরিকল্পনাকেন্দ্রিক আরো অনেক কাজ থাকে। জনবল সংকট থাকলে এ কাজগুলোও বিঘ্নিত হয়। তাই স্বাস্থ্য খাতে জনবল বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সঠিক পরিকল্পনা দরকার। সবার আগে দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসক কত হওয়া দরকার সেটির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মঈনুল আহসান বাপ্পি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা একটি বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার চিকিৎসক ও ডেন্টিস্ট নিয়োগ দিতে যাচ্ছি। এ নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তাই উপজেলাভিত্তিক যে পদগুলো ফাঁকা রয়েছে সেগুলোয় নিয়োগ দেয়া হবে। পাশাপাশি অন্য পদগুলোয় নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জনবল সংকট সমাধান একবারে করা সম্ভব না। ধীরে ধীরে আমরা এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।’

আরও