থানচি বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস

আয়ুষ্কালের আগেই জরাজীর্ণ ভবন ঝুঁকিতে আবাসিকে থাকা শিশুরা

পাহাড়ি অঞ্চলগুলো দুর্গম হওয়ায় শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করা বেশ কঠিন।

পাহাড়ি অঞ্চলগুলো দুর্গম হওয়ায় শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করা বেশ কঠিন। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পার্বত্য অঞ্চলের বেশকিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ছাত্রাবাস। যাতে শিশুরা আবাসিকে থেকে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায়। তবে দেশের সমতলভূমির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রাবাস নেই। বান্দরবানের থানচি বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসটি নির্মাণ করা হয়েছিল ২০১২ সালে। সাধারণত ভবন নির্মাণের পর থেকে এর আয়ুষ্কাল ৭০-১০০ বছর পর্যন্ত হয় বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা। তবে ছাত্রাবাসটি এক যুগেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনার শঙ্কায় রয়েছে আবাসিকে থাকা ৬৭ শিক্ষার্থী।

বিদ্যালয়সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১২ সালে ছাত্রাবাস ভবনটি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের দুই বছর পরই দেখা দেয় একটি দেয়ালে ফাটল। তখন থেকে বিভিন্ন সময় বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অফিসে জানানো হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি বলে জানান ছাত্রাবাসটির তত্ত্বাবধায়ক ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এর মধ্যে ফ্লোর ডেবে যাওয়া, একাধিক দেয়ালে ফাটলসহ ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ও শ্যাওলা জমেছে।

ভবনটি নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এতে অর্থায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি)। এলজিইডির তথ্য বলছে, নির্মাণ শেষে ২০১২ সালের ২২ এপ্রিল ছাত্রাবাসটি উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী)। পিইডিপি কর্মসূচির অর্থায়নে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। চারতলা ভবনটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছিলেন মো. আনিসুর রহমান সুজন নামে এক উপঠিকাদার। মাটির ভারবহন ক্ষমতা ও নকশা সংক্রান্তসহ প্রকৌশলগত সার্বিক পরীক্ষার ফলাফলের হিসাব অনুযায়ী করা প্রাক্কলন ও নকশা অনুযায়ী এ ধরনের ভবনের আয়ুষ্কাল ধরা হয় অন্তত ৭০ বছর।

অবশ্য সরকারি একাধিক প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির মাধ্যমে নির্মাণকাজের মান, ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রয়োগ করা হলে একটি ভবনের আয়ুষ্কাল সাধারণত ৭৫-১০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। মাঝারি মানের হলে ৪০-৬০ বছর এবং নিম্নমানের হলে ২০-৩০ বছরের মধ্যেই ফাটল বা ক্ষতি দেখা দিতে পারে।

এ ব্যাপারে থানচি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রাক্কলন করে এলজিইডির প্রধান দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রধান দপ্তর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’

এছাড়া গত আগস্টে রাঙ্গামাটির এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবগত করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে একান্তে বিষয়টি জেনেও নেন তিনি। এর আগে অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে ২০২৬ সালে শুরু হতে যাওয়া পিডিইপি-৫ কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথমেই ছাত্রাবাসটির রক্ষণাবেক্ষণ কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে ঘোষণা দেন তিনি। এজন্য আগামী বছরের জুলাইয়ে ছাত্রাবাসটির রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রকৌশলী মো. আবু হানিফ।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ছাড়া অন্য ছয়টি উপজেলায় সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রাবাস রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালে বান্দরবান সদর উপজেলার বালাঘাটা ও আলীকদম উপজেলা সদরে প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন দুটি আবাসিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। সে সময় নির্মিত টিনশেডের এ দুই ছাত্রাবাস চালু থাকলেও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চার বছর মেয়াদে পিইডিপি-২ কর্মসূচির আওতায় জেলা সদরের কালাঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা উপজেলা সদরে একটি করে বিদ্যালয়সংলগ্ন ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। সেগুলো চালু রয়েছে।

থানচি বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক ও প্রধান শিক্ষক ক্যসাচিং মারমা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছাত্রাবাসটিতে ৮০ জন শিক্ষার্থী থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে ৬৭ শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ জনই ছাত্রী। ভবনটির পশ্চিম দিকের কক্ষগুলো ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই অংশের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে পানি পড়ার কারণে ছাদে ছত্রাক জমে গেছে। আরেকটি কক্ষে সারা বছর পানি চুইয়ে পড়ে। এ কারণে দ্বিতীয় তলার ফ্লোরে জমা পানি প্রতিদিন মুছে রাখতে হয়। ছাদ দিয়ে পানি পড়ার কারণে কয়েকটি ফ্যান অচল হয়ে গেছে। এছাড়া সোলার প্যানেলও কাজ করছে না। ভবনটি উদ্বোধনের দুই বছর পর থেকে নিচ তলার এক দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। সে সময় থেকে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে নিচ তলার একাধিক দেয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ডেবে গেছে ফ্লোরের একাংশও।’

এর আগে ২০১৪ সালে নিচ তলার দেয়ালে প্রথম ফাটল দেখা দেয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অফিসে মৌখিক ও লিখিত আকারে জানানো হয়েছে। তবে কোনো সুফল মেলেনি। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক ক্যসাচিং মারমা। এ অবস্থায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর বদলির আবেদনও করেছেন তিনি।

তবে বিষয়টি অবগত নন বলে জানিয়েছেন থানচি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সোনা মিত্র চাকমা ও ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিণয় চাকমা। ২০২৬ সালে পিইডিপি-৫ কর্মসূচি শুরু হলে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন সোনা মিত্র চাকমা।

আরও