প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নত স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে পিরোজপুর সদর হাসপাতাল। ১৯৯৭ সালে নতুন ভবন নির্মিত হলে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০০৫ সালে আরো ৫০টি বাড়িয়ে ১০০ শয্যা করা হয়। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন করতে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৭ সালে। প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নয় তলা ভবনবিশিষ্ট হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে। তবে লিফট স্থাপন না করায় নতুন ভবনে এক বছরেও চালু হয়নি চিকিৎসা কার্যক্রম। ফলে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জেলার প্রায় ১৮ লাখ মানুষ। চিকিৎসার জন্য যেতে হচ্ছে খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ১০০ শয্যার হাসপাতালে অধিকাংশ সময়ই রোগী ভর্তি থাকে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ। শয্যা না পেয়ে রোগীদের থাকতে হচ্ছে মেঝে ও বারান্দায়।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য বলছে, ১২ তলাবিশিষ্ট হলেও প্রথমে সাতটি ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও বরাদ্দ পেয়ে দরপত্র আহ্বান করে গণপূর্ত বিভাগ। পরে আরো দুইতলা সম্প্রসারণ করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। দরপত্র অনুযায়ী ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ পায় বঙ্গ বিল্ডার্স লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে অষ্টম তলা ও ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নবম তলার নির্মাণকাজ করে যথাক্রমে খান বিল্ডার্স ও কোহিনূর কনস্ট্রাকশন। নবনির্মিত আধুনিক ভবনটিতে রয়েছে সিসিইউ, আইসিইউ বিভাগ, শতাধিক কেবিনসহ পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড, পৃথক করোনা ও ডেঙ্গু ওয়ার্ড। ভবনটিতে রাখা হয়েছে চারটি লিফট। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারীর কারণে তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় নির্মাণকাজ।
এ ব্যাপারে পিরোজপুর গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. নুরুজ্জামান বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে লিফট ও কিছু বৈদ্যুতিক কাজ বাকি রয়েছে। লিফট বসানো হলে বাকি কাজগুলোও শেষ হয়ে যাবে। তখন ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন ভবনে চারটি আধুনিক লিফট স্থাপনের জন্য ২০২২ সালে চারবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেননি। সে সময়ে লিফট স্থাপনে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। তবে বাজারমূল্যের চেয়ে বরাদ্দ কম থাকায় এ কাজের জন্য কোনো ঠিকাদার অংশগ্রহণ করেননি বলে গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানায়।
এ ব্যাপরে গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রাইসুল ইসলাম জানান, হাসপাতালটিতে চারটি লিফট স্থাপনের জন্য চারবার দরপত্র আহ্বান করেও কোনো ঠিকাদার পাওয়া যায়নি। বাজারমূল্যের চেয়ে কম বরাদ্দের কারণে ঠিকাদার টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেননি। তবে লিফট স্থাপনের জন্য ৬ কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
নতুন ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী নিয়ে পুরনো ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা। রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের।
এ বিষয়ে পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ রোগী প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে আসে। হাসপতালের ডাক্তার-নার্সরা যথাসম্ভব সর্বোচ্চ সেবা দিচ্ছেন। নতুন ভবনটি দ্রুত হস্তান্তর হলে সেবার মান আরো বাড়বে এবং ভোগান্তিও কমবে। তবে নতুন ভবনের লিফট সমস্যার কারণে সেটি বুঝে নেয়া হচ্ছে না। দ্রুত লিফট স্থাপনের জন্য গণপূর্ত বিভাগ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হবে। নতুন ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা গেলে এখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারসহ জনবল পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম আসবে। নতুন ভবনের লিফট বসানো এবং হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য আলাদা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।’