তৃতীয় পক্ষ শ্রম অসন্তোষ ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে, সতর্কতা জানিয়ে বিজিএমইএর চিঠি

মে মাসের বেতন দেয়নি ২৬৯ পোশাক ও বস্ত্র কারখানা

দেশের শিল্প-কারখানাগুলোয় প্রতি বছর ঈদের আগ মুহূর্তে এক ধরনের অস্থিরতার শঙ্কা সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বড় শ্রমঘন শিল্প পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৃতীয় কোনো পক্ষ শ্রম অসন্তোষ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। সেজন্য পোশাক কারখানাগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ বিষয়ে

দেশের শিল্প-কারখানাগুলোয় প্রতি বছর ঈদের আগ মুহূর্তে এক ধরনের অস্থিরতার শঙ্কা সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বড় শ্রমঘন শিল্প পোশাক খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৃতীয় কোনো পক্ষ শ্রম অসন্তোষ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। সেজন্য পোশাক কারখানাগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে কারখানাগুলোয় পাঠানো হয়েছে চিঠি। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছর পোশাক শিল্পে যে সংকট পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা গত তিন দশকেও দেখা যায়নি। এর পরও বেতন-ভাতা পরিশোধের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

৬ জুন জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৭৫তম এবং আরএমজি টিসিসির ১৫তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিল্প-কারখানার বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে আলোচনা করেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। সভায় বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে এমন কারখানার বিষয়েও আলোচনা করা হয়। সভা সূত্র জানিয়েছে, এ সভার আলোচনায় ৯৬টি কারখানার বেতন-ভাতা পরিশোধ পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯ জুন সংগঠনের সদস্যদের উদ্দেশে চিঠি দিয়েছে বিজিএমইএ। সভাপতি ফারুক হাসান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ৬ জুনের সভায় নেয়া সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পোশাক শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস ও ছুটি প্রসঙ্গে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে শ্রম অসন্তোষ ঘটার বিষয়ে সদস্য কারখানাগুলোকেও দেয়া হয়েছে সতর্কবার্তা। 

চিঠিতে সদস্য কারখানার উদ্দেশে বলা হয়, ‍গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট মোতাবেক তৃতীয় কোনো পক্ষ শ্রম অসন্তোষ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কারখানায় শ্রম অসন্তোষ ঘটতে পারে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে প্রয়োজনে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কলকারখানা অধিদপ্তর অথবা বিজিএমইএর সঙ্গে আলোচনা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংগঠনের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি থেকে বেতন-ভাতা পরিশোধের সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বকেয়া বেতন পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে। কারণ এ খাতে এখন সবাইকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ক্রয়াদেশ কম। যেসব পণ্য রফতানি হয়, সেগুলোর অর্থ পরিশোধ হয় না। আবার ক্রেতারা মূল্যহ্রাসেরও দাবি করছে। অনেক ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। কথায় কথায় এখন ক্রয়াদেশ ডিসকাউন্ট আর ক্যানসেল করা হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর উইন্টার বা শীতকালীন ক্রয়াদেশও কম।’

ঈদের ছুটির আগেই শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বোনাস এবং জুনের ১৫ দিনের বেতন পরিশোধে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা রয়েছে। সেখানে গত মে মাসের বেতনই পরিশোধ করেনি শিল্প অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৬৯টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা। শিল্পসংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

দেশে শিল্প অধ্যুষিত আটটি এলাকা রয়েছে—আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেট। এসব এলাকায় মোট শিল্প-কারখানা রয়েছে ৯ হাজার ৯১৫টি। এর মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র খাতের কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ৬৮২। এসব কারখানার মধ্যে গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৬৯টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা মে মাসের বেতন পরিশোধ করেনি।

শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে মে মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে এমন শিল্প-কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৮৫। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১৪০টি কারখানায় বেতন বকেয়া রয়েছে। পোশাক খাতের আরেক সংগঠন বিকেএমইএ সদস্যদের মধ্যে বেতন বকেয়া থাকা কারখানার সংখ্যা ৮৮টি। সেই সঙ্গে সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্র খাতের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য ৪১টি কারখানার শ্রমিকদের মে মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।

পোশাক ও বস্ত্র খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তিন দশকের মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের কারখানাগুলোকে সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বিরূপ পরিস্থিতির আশঙ্কা যেন বাস্তবে রূপ নিতে না পারে, সেজন্য এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে। 

বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন অধিকাংশ কারখানা ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় সচল রয়েছে। তুলনামূলক ছোট কিছু কারখানা আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। মে মাসের বেতন কয়টি কারখানায় হয়নি তার আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে বন্দোবস্ত করে কারখানাগুলোকে বেতন দিতে হবেই। গত ৩০ বছরের ইতিহাসে এখনকার মতো ডিফিকাল্ট পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি। এত ক্রিটিক্যাল টাইম আগে কখনো পার করতে হয়নি আমাদের। আমরা আশঙ্কা করছি, তবে আশঙ্কা করলেও শ্রমিকদের যেন পাওনা পরিশোধ করা হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়ে আমরা সচেতন। শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করার জন্য এরই মধ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে সব সদস্য কারখানাকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হয়েছে।’

শিল্পসংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শিল্প এলাকাগুলোয় জুনের ১৫ দিনের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ শুরু হয়েছে। সব খাত মিলিয়ে ৯ হাজার ৯১৫টি কারখানার মধ্যে মাত্র ৫৫টি কারখানা জুনের ১৫ দিনের বেতন পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর মাত্র একটি কারখানা এ বেতন পরিশোধ করেছে। 

বিকেএমইএ ও বিটিএমএর সদস্য কোনো কারখানা গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত জুনের বেতন পরিশোধ করেনি। আর বোনাস পরিশোধ করেছে এমন কারখানাগুলোর মধ্যে বিকেএমইএর ৬৪টি ও বিটিএমএর কারখানার সংখ্য ৪৫। এছাড়া কেবল বোনাস পরিশোধ করা বিজিএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ১৫৪।

আরও