এবার ৩২ আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি ১১ দলীয় জোটের

জোটের মুখপাত্র বলেন, কালো টাকা, অস্ত্র ও হুমকি-ধমকির পাশাপাশি আমরা নির্বাচন ম্যানিপুলেশনের নানা অভিযোগ পেয়েছি। কিছু কেন্দ্রে কর্তব্যরত কর্মকর্তারাই ব্যালটে সিল মারার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও দলীয় কর্মীরা সিল মেরেছেন। কোথাও ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়া হয়েছে, ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে, ফলে ভোট কাস্টিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ভোটে জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগে ৩২ আসনের ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। আজ রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে তারা এ দাবি জানায়।

সিইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোটের মুখপাত্র হামিদুর রহমান আযাদ। এ সময় নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে আগামীকাল সোমবার প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বাংলাদেশের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ঐতিহাসিক দিন। এদিনে রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে রেফারেন্ডাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি শুধু দেশবাসীর নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত একটি নির্বাচন ছিল। সবারই আকাঙ্ক্ষা ছিল—অতীতের প্রহসনমূলক নির্বাচন থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুন্দর, অংশগ্রহণমূলক, উৎসবমুখর ও ঐতিহাসিক নির্বাচন আমরা উপহার পাব। ভোট গ্রহণের প্রথম ধাপে অতীতের তুলনায় কিছু গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বড় ধরনের খুনাখুনি বা ভয়াবহ সহিংসতা দৃশ্যমান ছিল না—এটি আমরা স্বীকার করি।

তিনি বলেন, ভোটগ্রহণের সময় কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে আমরা দেখেছি, সার্বিক পরিবেশ ছিল অসুস্থ ও প্রশ্নবিদ্ধ। শুরুটা ভালো হলেও সমাপ্তি সুন্দর হয়নি। ভোট গ্রহণের সময় ব্যাপকভাবে জাল ভোট, কালো টাকার ছড়াছড়ি, হুমকি-ধমকি, সন্ত্রাস, মারামারি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও বড় কোনো একক ঘটনা হয়নি, তবুও এসব উপাদান একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট বাধা সৃষ্টি করেছে এবং পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব অভিযোগের কার্যকর কোনো প্রতিকার আমরা দেখতে পাইনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকেও অস্ত্র উদ্ধার সংক্রান্ত উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন নিজেই জানিয়েছে, এখনো চার শতাধিক পিস্তল উদ্ধার হয়নি। কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়ে গেছে। এসব অস্ত্র নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে—এমন রিপোর্ট আমাদের কাছে রয়েছে।

জোটের মুখপাত্র বলেন, কালো টাকা, অস্ত্র ও হুমকি-ধমকির পাশাপাশি আমরা নির্বাচন ম্যানিপুলেশনের নানা অভিযোগ পেয়েছি। কিছু কেন্দ্রে কর্তব্যরত কর্মকর্তারাই ব্যালটে সিল মারার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও দলীয় কর্মীরা সিল মেরেছেন। কোথাও ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়া হয়েছে, ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে, ফলে ভোট কাস্টিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আমরা ১১ দলীয় জোট একসঙ্গে এসব বিষয় বারবার স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছি। কিন্তু সন্তোষজনক কোনো পদক্ষেপ আমরা পাইনি। নির্বাচন শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। নিয়ম অনুযায়ী ফল গণনা শুরু হয় সাড়ে সাতটায়। কিন্তু দুই থেকে তিন ঘণ্টা পার হওয়ার পরও অনেক কেন্দ্রে ভোট কাস্টিংয়ের তথ্য স্বাভাবিক ছিল না। আবার শেষদিকে কিছু কেন্দ্রে হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ব্যালট ব্যবহারের প্রশ্ন থেকেই যায়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভোট গণনার ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। বহু কেন্দ্রে এজেন্টদের জোর করে বের করে দেয়া হয়েছে, নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে, অভিযোগ করলে হুমকি দেয়া হয়েছে। ফলে সুষ্ঠু গণনার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি ফলাফলের ওপর পড়েছে।

ফলাফল শিটে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে দাবি করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমরা দেখেছি বহু জায়গায় রেজাল্ট শিটে কাটাছেঁড়া, ওভাররাইটিং হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর আসল এজেন্টের স্বাক্ষর নেয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা–৬ আসনে রেজাল্ট শিট পেন্সিলে লেখা হয়েছে। সেখানে আমাদের প্রার্থী ছিলেন দাঁড়িপাল্লার ডা. আব্দুল মান্নান। রেজাল্ট শিটে আমাদের মুসলিম এজেন্ট থাকার পরও অন্য একজন হিন্দু ভদ্রলোকের নাম লেখা হয়েছে। এতে রেজাল্ট শিটের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে। এ প্রেক্ষাপটে আমরা ৩২টি আসন চিহ্নিত করেছি, যেখানে স্বল্প ভোটের ব্যবধানে আমাদের প্রার্থীদের হারিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছি। মামুনুল হক, নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীসহ একাধিক প্রার্থীর বিষয়টি কমিশনের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ওমর ফারুক সাহেব নিজে উপস্থিত থেকে এভিডেন্স উপস্থাপন করেছেন। আমরা আরো অভিযোগ করেছি—অযোগ্য প্রার্থীদের বৈধ ঘোষণা, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নির্বাচন শেষের পর তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ। ১২ তারিখ নির্বাচন, ১৩ তারিখ রাত ১১টায় গেজেট। ফলে দূরবর্তী এলাকার প্রার্থীরা অভিযোগ করার সুযোগই পাননি। এমনকি নির্বাচন কমিশনে এসেও বলা হয়েছে—গেজেট হয়ে গেছে, সুযোগ নেই। আমরা আগেই কমিশনকে অনুরোধ করেছিলাম—অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে গেজেট প্রকাশ করবেন না। প্রশ্ন হলো, এই তাড়াহুড়োর কারণ কী? অভিযোগ এড়ানোর চেষ্টা কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে রক্তের বিনিময়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি কি আবার ঘটছে? হাতিয়া, ২০১৮ সালের নারকীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি কি আমরা আবার দেখছি? আমার নিজের আসনেও তিনজন নারী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। আমরা ৫৪টি জেলার সহিংসতার রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি। আমরা সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করব, শপথ গ্রহণ করব এবং আইনি পথ অনুসরণ করব। কিন্তু সহিংসতা চললে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামতেও পিছপা হব না। এ প্রেক্ষাপটে আমরা আগামীকাল বিকাল সাড়ে চারটায় বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছি।

আরও