কালবৈশাখীতে বিপর্যস্ত কক্সবাজারের লবণ মাঠ

হঠাৎ কালবৈশাখীর ঝোড়ো হাওয়া ও হালকা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।

৭ এপ্রিল থেকে টানা দমকা বাতাস ও বৃষ্টির কারণে উৎপাদিত ও উৎপাদনাধীন বিপুল পরিমাণ লবণ গলে পানিতে মিশে গেছে। এতে প্রান্তিক লবণচাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

জেলার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ও ঈদগাঁও, পেকুয়ার মগনামা ও রাজাখালী, মহেশখালীর কুতুবজোম ও বড় মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ ও শামলাপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চাষীরা জানান, বৃষ্টির পানিতে মাঠে জমে থাকা লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা বেড বা ‘কাই’ নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত পাঁচ থেকে সাতদিন লাগবে। এতে মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী এলাকার লবণচাষী উম্মত আলী বলেন, ‘এমনি লবণের দাম কম, তার ওপর হঠাৎ বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি। আমার কয়েকশ মণ লবণ বৃষ্টির পানিতে গলে গেছে। এ মৌসুমে কোনো চাষীই মনে হয় লাভের মুখ দেখবেন না।’

পেকুয়ার উজানটিয়া করিয়ারদ্বিয়া এলাকার চাষী মনজুর আলমও একই ধরনের হতাশার কথা জানান। ‎একই সুর মহেশখালীর আনচার উল্লাহ ও গিয়াসউদ্দিনের কণ্ঠেও। তাদের ভাষায়, মৌসুমের শেষ সময়ে এমন ক্ষতি সামাল দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নতুন করে মাঠ প্রস্তুত করতে বাড়তি খরচের বোঝাও যোগ হয়েছে।

‎বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণের চাহিদা রয়েছে। এ লক্ষ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকায় প্রায় ৬৯ হাজার একর জমিতে ৪১ হাজারের বেশি চাষী লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত।

‎শুধু মহেশখালীতেই প্রায় ১৭ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়, যেখানে অনুকূল আবহাওয়ায় গড়ে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদন হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

টেকনাফের লবণ ব্যবসায়ী হোসাইন মো. আনিম ও সরওয়ার কামাল জানান, বৃষ্টির কারণে আপাতত মাঠে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আবার নতুন করে মাঠ প্রস্তুত করতে হবে। রোদ দেখা দিলে পুনরায় লবণ উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম চালু করা হবে।

তারা জানান, দেশে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। তাই বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ রেখে দেশীয় লবণের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

বিসিক কক্সবাজারের জেলা পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী জানান, গত দুইদিনের বৃষ্টিতে মজুদ লবণের কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সাগরের লোনাপানির লবণাক্ততা কমে যাওয়া ও মাঠের ক্ষতি হওয়ায় লবণ উৎপাদন বন্ধ আছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টন লবণ থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে।

বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, ‘সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে অনেক চাষী নিজেদের উদ্যোগে কিছু লবণ বাঁচাতে পেরেছেন। বৃষ্টির কারণে মাঠের লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় পুনরায় উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। এতে জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’

স্থানীয়দের মতে, মৌসুমের শেষ সময়ে এসে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ চাষীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত লবণচাষীদের টিকে থাকতে জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। না হলে এ ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে অনেক চাষীর জন্য বড় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

আরও