পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে দেশে কৃষি উৎপাদন ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতসহ নানা কারণে বাড়ছে ফসলের ক্ষতি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ১৫ বছরে দেশে ধানের ফলন ৪ শতাংশ, সবজির ফলন ৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ডালজাতীয় শস্যের ফলন ৬ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) গতকাল আয়োজিত ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস। জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ কৃষি খাতের ওপর ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ‘কৃষির চ্যালেঞ্জটা কী? চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ন্যূনতম তাপমাত্রা পঞ্চাশের দশক থেকে দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা স্বাভাবিক আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কিছুটা শিথিল থাকার পর আশি-নব্বইয়ের দশক থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী। বৃষ্টিপাতের পরিমাণের উত্থান-পতন আছে। তবে স্বাভাবিকভাবে এটিও ঊর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ আমাদের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। অধিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সবকিছু কৃষির ফলনের ওপর প্রভাব ফেলছে।’
প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিআইডিএসের এ গবেষণা পরিচালক জানান, পরিবেশগত এ চ্যালেঞ্জের কারণে আগামী দেড় দশকে অর্থাৎ ২০৪০ সালের মধ্যে ধানের ফলন কমতে পারে ৪ শতাংশ। যেটি ২০৫০ সালে গিয়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। আর ২০৩০ সালে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের কারণে ধানের ফলন কমবে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে ২০৪০ সালে গমের ফলন কমতে পারে ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০৫০ সালে এ খাদ্যশস্যের ফলন ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে কমতে পারে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০৩০ সালে পাটের ফলন কমবে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০৪০ সালে যেটি কমবে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে কমার হার বেড়ে হবে ৩ শতাংশ।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে সবজি, ডাল ও তেলবীজ জাতীয় শস্যেরও। আগামী দেড় দশকে সবজির ফলন কমতে পারে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০৫০ সালে ফলন কমার হার বেড়ে হবে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০৩০ সালে কমার হার থাকবে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০৪০ সালে ডালের ফলন কমবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০৫০ সালে এ হার হবে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তেলবীজ জাতীয় শস্যের ফলন ২০৩০ সালে কমবে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০৪০ সালে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে কমার হার হবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
সেমিনারে বলা হয়, জলবায়ুর প্রভাব শুধু ফসলেই থেমে নেই—এর ফলে শ্রম উৎপাদনশীলতাও কমছে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে কৃষি শ্রমিকরা দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে পারেন না। এতে কৃষি শ্রমের জোগান এবং উৎপাদনশীলতা দুটোই কমছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাপজনিত কারণে শ্রম আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রায় ১১ শতাংশ ক্ষতি হবে। যেটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বেশি। শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংকোচন হতে পারে।
তবে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বাইরেও কৃষির অপরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেমিনারে বলা হয়, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তি গ্রহণে এখনো বাধা রয়ে গেছে। কৃষিযন্ত্রে ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ ভর্তুকি থাকলেও সেটি যথেষ্ট নয়। কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ, সুস্পষ্ট নীতিমালা ও বাণিজ্য বিধান, শক্তিশালী এক্সটেনশন সেবা, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মতো আরো কিছু সহযোগিতা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র কৃষকরা তথ্য ও অর্থ দুটোই কম পান। যেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া চাল ছাড়া অন্যান্য খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা বেশি রয়েছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকের লাভ কমিয়ে দিচ্ছে। সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি ফলন বাড়ালেও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে—বিশেষ করে উচ্চফলনশীল বোরো ধানের ক্ষেত্রে। ক্ষুদ্র কৃষকরা নগদ টাকার প্রয়োজন হওয়ায় ফসল কাটার পরপরই কম দামেই ধান ও শস্য বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। চালের বাজারে অল্পসংখ্যক মিলার ও ব্যবসায়ীর আধিপত্য (অলিগোপলি) থাকায় মুনাফার বড় অংশ তারা দখল করে নেয়। ফসল বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় সমস্যা। উপযুক্ত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণের অভাব ও দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এছাড়া নীতিগত নানা সীমাবদ্ধতা কৃষির সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে এ সময় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতার। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের যে তথ্য দেয় তা সঠিক নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন তথ্য সঠিক হলে এত উৎপাদনের পরও কেন আমাদের খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়।’ এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেড়শটির মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও একটিও কৃষকের কল্যাণের প্রকল্প নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রকল্প নেয়া হয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে—এমন ইঙ্গিত করে সচিব শাকিল আখতার বলেন, ‘খামারবাড়িতে প্রায় দেড়শ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আপনাকে বুকে হাত দিয়ে বলতে হবে কৃষকের উন্নতির জন্য একটি প্রকল্প নেয়া হয় প্রতি বছর? যে কৃষক দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সবাই স্বীকার করে, দেড়শর মতো প্রকল্প হচ্ছে কিন্তু কৃষকের উন্নতির জন্য কয়টি প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করি? সব প্রকল্প করি প্রকল্প পরিচালক ও আদার্স পিপলসের পারপাস সার্ভ করার জন্য।’
সেমিনারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।