ঢাকার উপকণ্ঠে কালীগঞ্জের এক গ্রামে থাকেন রাশেদ মাহমুদ (ছদ্মনাম)। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন বছর তিনেক আগে। পরিবারের আশা ছিল, ছেলে ভালো একটি চাকরি পাবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, রাশেদ এখনো বেকার। তার নিজের ভাষায়, ‘আমি মোবাইল ব্যবহার করি, কিন্তু কম্পিউটার ঠিকমতো চালাতে পারি না। চাকরির অনেক আবেদনই অনলাইনে করতে হয়, সেগুলো করতে অন্যের সাহায্য নিই।’
রাশেদ কেবল একা নন; তার গল্পটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশের বাস্তব চিত্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) প্রবেশাধিকার ও ব্যবহার জরিপ ২০২৪-২৫’-এ উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের প্রায় ৪৫ শতাংশই কম্পিউটার ব্যবহার করেন না।
এ বিষয়ে রাশেদ মাহমুদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার কম্পিউটার ব্যবহারের তেমন সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্লাসে কম্পিউটার ল্যাব ছিল, কিন্তু খুব একটা ব্যবহার হতো না। পরীক্ষার জন্য তাত্ত্বিক পড়াশোনাতেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো।’
রাশেদ এখন নিজ উদ্যোগে কম্পিউটার শেখার চেষ্টা করছেন। পাশের বাজারে একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন। বললেন, ‘এখন বুঝতে পারছি, শুধু ডিগ্রি থাকলেই হয় না। দক্ষতা না থাকলে কিছুই করা যায় না।’
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষার স্তর যত বাড়ে, কম্পিউটার ব্যবহারও বাড়ে ঠিকই, তবে সে হার আশানুরূপ নয়। প্রাথমিক বা তার নিচে শিক্ষিতদের মধ্যে কম্পিউটার ব্যবহার মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, নিম্ন মাধ্যমিকে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। মাধ্যমিক ও ডিপ্লোমা পাসদের মধ্যে এই হার ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশে উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে তা মাত্র ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে।
রাশেদের মতো অনেক তরুণ এখন চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন শুধু ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে। ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন প্রায় সব চাকরিতেই কম্পিউটার জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো এ দক্ষতার ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয় না।’
জরিপে আরো দেখা গেছে, জাতীয়ভাবে মোট কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হার মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যের সঙ্গে একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহারিক আইসিটি শিক্ষার ওপর জোর বাড়াতে হবে। নইলে হাজারো তরুণ ডিগ্রি নিয়েও কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে।
মাধ্যমিক স্তর থেকেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয় পাঠ্যক্রমের অংশ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যানের সর্বশেষ তথ্যমতে, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কম্পিউটার ল্যাব আছে ৪০ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এবং আইসিটিডি ডিজিটাল ল্যাব ৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ বিদ্যালয়ে রয়েছে। কলেজ পর্যায়ে কম্পিউটার ল্যাব আছে ৬৪ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং আইসিটিডি ডিজিটাল ল্যাব রয়েছে ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া মাদরাসা পর্যায়ে কম্পিউটার ল্যাব ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সার্টিফিকেট অর্জন করলেই ডিজিটাল সুযোগ তৈরি হয় না। দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের আইসিটি ব্যবহারের মৌলিক ভিত্তি গড়ে ওঠে না। যদিও শিক্ষার সঙ্গে কম্পিউটার ব্যবহারের একটি ইতিবাচক সম্পর্ক আছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা একা এ সংকট সমাধান করতে পারছে না। বিদ্যালয় পর্যায়েই যে হাতে-কলমে ডিজিটাল দক্ষতার ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও অনেকেই ডিজিটাল কর্মবাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
এ বাস্তবতার প্রমাণ মেলে গ্রাম ও শহরের তুলনামূলক চিত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের মধ্যেও গ্রামে কম্পিউটার ব্যবহারের হার মাত্র ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামীণ উচ্চশিক্ষিতদের প্রায় ৬৭ শতাংশই কম্পিউটার ব্যবহার করেন না। বিপরীতে শহরে (সিটি করপোরেশন বাদে) একই শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের মধ্যে কম্পিউটার ব্যবহারের হার ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ, আর সিটি করপোরেশন এলাকায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ শতাংশে। নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরো তীব্র—গ্রামে ব্যবহার মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, শহরে ১২ দশমিক ৬ ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, অথচ বাস্তবতা তিন রকম।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য এ সংকটকে আরো স্পষ্ট করে। দেশে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায় সর্বত্র থাকলেও শিক্ষার উদ্দেশ্যে কম্পিউটার ব্যবহারের হার আশানুরূপ নয়। জাতীয়ভাবে মাত্র ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ব্যবহার করে। গ্রামে এ হার আরো কম, মাত্র ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে কম্পিউটার ছোঁয়ারই সুযোগ পায় না। শহরে এ হার ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। বিভাগভেদেও রয়েছে বড় পার্থক্য—ঢাকায় ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ব্যবহার করলেও সিলেটে তা ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ ও ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও তা প্রধানত মোবাইলনির্ভর। জরিপ অনুযায়ী, মোট ইন্টারনেট প্রবেশাধিকারের ৭৮ দশমিক ৪ শতাংশই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। কম্পিউটার বা ল্যাপটপের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে বোঝা যাচ্ছে, ডিজিটাল সংযোগ বিস্তৃত হলেও কম্পিউটারভিত্তিক দক্ষতা গড়ে উঠছে না। আর এ ঘাটতিই পেশাদার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং উচ্চতর ডিজিটাল অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ বাস্তবতাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করেন না গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরেই কথা বলছি, এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছি—কিন্তু বাস্তব চিত্র এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ কাজের জায়গায় সে প্রস্তুতিটা তৈরি করা যায়নি। শুধু সার্টিফিকেট থাকলেই দক্ষতা তৈরি হয় না। অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল বা পাওয়ারপয়েন্টের মতো মৌলিক সফটওয়্যার ব্যবহারে দক্ষ নন। ফলে কর্মক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা প্রায়ই অভিযোগ করেন, চাকরিপ্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কম্পিউটার স্কিলের অভাব রয়েছে।’
প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাস্তবতা তুলে ধরে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উপদেষ্টা জানান, অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়েই কম্পিউটার থাকলেও সেগুলো ব্যবহার হয় না। কোথাও ট্রাঙ্কের ভেতরে রাখা, কোথাও আবার ব্যবহার না করেই সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এর পেছনে তিনি তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন—শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি, প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুধাবনের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে উদ্বুদ্ধ না করা।
এ ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে। রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যে বাড়ছে, তার একটা বড় কারণ সম্ভবত এটাই। যেখানে এআই চলে আসছে, সেখানে দক্ষতা না থাকলে যত বড় মানবসম্পদই থাকুক, তারা বেকারই থেকে যাবে। তাই টিকে থাকতে গেলে দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। এসএসসি ও এইচএসসির পর যে বিরতি থাকে, সে সময়টায় ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণে যুক্ত করতে হবে।’