পল্লী সড়ক নির্মাণ

এক-তৃতীয়াংশের বেশি ব্যয় রক্ষণাবেক্ষণে

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার আতুয়াজঙ্গল বাজারে যাওয়ার ১ হাজার ২০০ মিটার সড়কটি পাকা করা হয় চলতি বছরের জুনে। এক মাস না যেতেই ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পল্লী সড়কটির বিভিন্ন জায়গার কার্পেটিং উঠে যায়।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার আতুয়াজঙ্গল বাজারে যাওয়ার ১ হাজার ২০০ মিটার সড়কটি পাকা করা হয় চলতি বছরের জুনে। এক মাস না যেতেই ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পল্লী সড়কটির বিভিন্ন জায়গার কার্পেটিং উঠে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো সড়কে ২৫ মিলিমিটার পিচ ঢালাইয়ের কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে ১৫ মিলিমিটার। ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের বিটুমিন।

শুধু হালুয়াঘাটের এ সড়কই নয়, প্রতি বছর সড়ক ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে সরকারকে ব্যয় করতে হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। নিম্নমানের কাজের জন্য কিছুদিন পরই তা বেহাল হয়ে পড়ে। শুরু হয় রক্ষণাবেক্ষণের তোড়জোড়। পাস হয় নতুন বাজেট। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন সড়ক অবকাঠামোর কাজ। টেকসই সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত না করে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। গত এক দশকে এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। গত অর্থবছরের হিসাবেই প্রতি কিলোমিটার পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হয়েছে নির্মাণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অর্থ। এভাবে সরকারি টাকা অপচয় না করে সরকারকে টেকসই নির্মাণের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সময়ান্তর (নির্দিষ্ট সময় পর) সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে সরকার ব্যয় করেছে ২ হাজার ৫৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ অর্থে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার সড়ক। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৩৮ লাখ টাকারও বেশি। বিপরীতে ৩ দশমিক ৭ মিটার চওড়া এক কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে নির্মাণ ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যয় করতে হয় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে, তাও আবার এক-দুই বছর না যেতেই। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে এক কিলোমিটার পল্লী সড়ক নির্মাণে খরচ হয় মাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার রুপি, টাকার হিসাবে আড়াই লাখের মতো (ভারতের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য)।

সাধারণত একটি সড়ক নির্মাণের পর তা ১০-১৫ বছর টেকসই হওয়ার কথা। তবে পল্লী সড়ক নির্মাণের পর তা দুই বছরের বেশি টেকে না বলে অভিযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের নির্মাণকাজের জন্যই রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়। এছাড়া বারবার প্রকল্প পেলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীরও সুবিধা। এটা জনগণের অর্থের নিদারুণ অপচয়। এর পরও প্রতি বছর এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে গেছে সরকার।

সড়ক নির্মাণে আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) না করে রাজনৈতিক প্রভাব ও মানহীন ঠিকাদারের কারণেই নির্মাণকাজ গুণগত টেকসই হয় না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো নির্মাণে নিয়মানুযায়ী লাইফসাইকেল অ্যানালাইসিস করার কথা। ১৫ বছর মেয়াদি একটা অ্যানালাইসিস করে মজবুত সড়ক নির্মাণ করলে প্রাথমিকভাবে হয়তো বেশি টাকা লাগবে। কিন্তু সেটি টেকসই হবে। অন্যদিকে দুর্বল সড়ক নির্মাণ করলে দুই-তিন বছর পরপর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে, এতে বড় একটা বাজেট যাবে। এখন ১৫ বছরের লাইফ সাইকেল বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনটা আমাদের সহনীয়।’

স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের গত ১০ বছরের ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৭৫৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় ৬ হাজার ৭০০ কিলোমিটার সড়ক সময়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছে। এছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯০১ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় রক্ষণাবেক্ষণ হয় ৬ হাজার ৫৬১ কিলোমিটার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১০ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ৬ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকায় ৭ হাজার ৮৭ কিলোমিটার সড়ক। এর পরের অর্থবছর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি অর্থের বরাদ্দও বেড়ে যায়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার ২০০ কিলোমিটার সংস্কারে প্রায় ১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সে বরাদ্দ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮১৫ কোটি ২১ লাখ টাকায়। ওই অর্থে ৬ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করে এলজিইডি। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে ১৭ হাজার ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল এ খাতে। এর মধ্যে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ৮০৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। বাকি পুরোটাই ব্যয় করা হয়েছে সময়ান্তর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে।

এলজিইডির প্রায় সব প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরনো। এ অভিযোগ স্বীকার করে এলজিইডির এক ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মূলত রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজির কারণেই সঠিকভাবে সড়ক তৈরি করা যায় না। তাদের খুশি করা ছাড়া কাজে হাত দেয়া যায় না। এরপর ঠিকাদার চাইলেও মানসম্পন্ন উপাদান ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে সড়কের গুণগত মান সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। আমাদের সামাজিক পরিস্থিতিই নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য করে। এতে নির্মাণের অল্প কিছুদিনের মাথায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।’

বিশেষজ্ঞরা টেকসই সড়কের মেয়াদকাল ১০-১৫ বছর দাবি করলেও ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত তিন বছর পরই সড়কগুলো সময়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় পড়ে। তবে নির্মাণের এক বছরের মধ্যে সড়কে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেক্ষেত্রে ঠিকাদারকেই তা মেরামত করে দিতে হয়। এ সময়ের পর তা বিভাগের অধীনে চলে যায়।’

ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘এখানে সাধারণ স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবকে এক পাশে রেখে বা বাদ দিয় ঠিকাদারের মান কীভাবে উন্নত করা যায়, সে বিষয়টা ভাবা জরুরি। আরেকটা বিষয় হলো, এত টাকা যেখানে ব্যয় হচ্ছে, সেখানে তো আরঅ্যান্ডডি করা উচিত। কোনো প্রকল্পে ১০০ টাকা ব্যয় হলে সেখান থেকে ১ টাকা আরঅ্যান্ডডিতে ব্যয় করতে তো অসুবিধা নেই। গত ১০ বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলে, তার ১ শতাংশ অন্তত আরঅ্যান্ডডিতে ব্যয় করা উচিত ছিল। মানুষের এত টাকা ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু আরঅ্যান্ডডি করা হচ্ছে না—সেটাও একটা অপরাধ। ঠিকাদারের ৪০ বছর আগে যে মান ছিল, এখনো কেন একই মান? কেন উন্নতি হচ্ছে না? রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠা, অন্তত ১ শতাংশ আরঅ্যান্ডডিতে ব্যয় ও সাধারণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলেই অনেক উন্নতি হয়ে যাবে।’

এলজিইডি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যা, অতিবৃষ্টি, ভারী যানবাহন চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে পল্লী সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সে কারণেই নির্মাণ অথবা সংস্কারের কিছুদিন পরই সড়কে ফাটল ও গর্তের সৃষ্টি হয়। এসব বিষয়ে কথা হয় এলজিইডির রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিমের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মাটি গঠনগত দিক থেকে বৈচিত্র্যময়। বড় বড় সড়কেও মাটির ভেতর বিভিন্ন সময় ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে সড়কে গর্ত তৈরি ও ফাটল সৃষ্টি হয়। মূলত ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারী যানবাহনের চলাচলের কারণে অল্প সময়ে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।’

আরও