কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চ বিদ্যালয়

ভাঙা বেড়া, পাঠদানের সময় ঢোকে সাপ-পোকামাকড়

আকাশে মেঘ জমলেই থমকে যায় তাদের মনোযোগ। কালবৈশাখী বা ভারি বর্ষায় নয়, সামান্য বৃষ্টিতেই শ্রেণীকক্ষে পড়ে পানির ফোঁটা।

আকাশে বৃষ্টি মাটিতে নামার আগেই যেন বিদ্যালয়ের কক্ষগুলোর ভেতরে পড়তে শুরু করে পানি। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পার হয়ে গেছে। তবুও পুরনো জরাজীর্ণ বাঁশের অবকাঠামোয়ই চলছে পাঠদান। মাঝেমধ্যেই বাঁশের বেড়া ভেঙে শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পড়ে বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়। এমন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষা গ্রহণ করছে পাহাড়ঘেরা দুর্গম অঞ্চলের ৩১৬ জন শিক্ষার্থী।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের একটি চরম অবহেলিত পাহাড়ি গ্রাম ‘পশ্চিম সোনাই’। এখানে বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থান। ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের এ যুগেও গ্রামটিতে রয়েছে বিশুদ্ধ পানি, মোবাইল নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ও শিক্ষার সংকট। পাহাড়ে শিক্ষার এ অন্ধকার দূর করতে ১৯৯৫ সালে এগিয়ে আসেন তিন শিক্ষানুরাগী।

জানা গেছে, তৎকালীন স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মহিউদ্দিন মেম্বার, জসিম উদ্দিন ও ফজলুল করিম নামের ওই তিন ব্যক্তি কয়লা পশ্চিম সোনাই এলাকায় ৭৫ শতাংশ জায়গা দেন। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে ‘কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চ বিদ্যালয়’। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর পাহাড়ের দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা অবশেষে শিক্ষার মুখ দেখতে পায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পার হয়ে গেলেও বিদ্যালয়টি আজও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ বিদ্যাপীঠে বর্তমানে ৩১৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে শতাধিক শিক্ষার্থী স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। শ্রেণীভিত্তিক শিক্ষার্থী হিসেবে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ৭২ জন, সপ্তম শ্রেণীতে ৬২, অষ্টম শ্রেণীতে ৬৫, নবম শ্রেণীতে ৭২ ও দশম শ্রেণীতে ৪৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিদ্যালয়টিতে সরকারি সুবিধা বলতে মেলে কেবল বিনামূল্যে বই। তবে নেই কোনো উপযুক্ত ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ বা মেয়েদের কমন রুম। এমনকি মানসম্মত শৌচাগারও নেই এখানে।

চলতি বছর অন্তত চার-পাঁচটি বিষাক্ত সাপ পাঠদানের সময় শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন,"‘শিক্ষার্থীরা সবসময় ভয়ে থাকে। বর্ষাকালে পানি পড়ার কারণে ক্লাসে টেকাই দায় হয়ে পড়ে।’"

বিদ্যালয়ের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রিয়ামনি ত্রিপুরা ও কবিতা রানী ত্রিপুরা জানায়, তাদের গ্রাম থেকে করেরহাট কেএম উচ্চ বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ১৭-১৮ কিলোমিটার। পথ অনেকটা দূরে হওয়ায় আগে তাদের পাড়ার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারত না। কিন্তু বাড়ির পাশে বিদ্যালয়টি হওয়ায় তারা পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু স্কুলটি নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত।

একই কথা জানায় দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার রিয়া ও ওমর ফারুক। তারা জানায়,"বর্ষায় বৃষ্টির পানি মাটিতে পড়ার আগেই তাদের শ্রেণীকক্ষে পড়ে। এছাড়া ভাঙা বেড়া দিয়ে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড় ঘরে ঢুকে যায়। তাদের একটাই দাবি, দ্রুত বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা হোক এবং একটি নতুন ভবন তৈরি করে দেয়া হোক।"

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম আরো বলেন,"‘পাহাড়ি অঞ্চলের এ বিদ্যালয় পুরো এলাকার জন্য শিক্ষার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে। আমাদের বিদ্যালয় থেকে অতীতে জেএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাস করার সাফল্য রয়েছে। কিন্তু মারাত্মক আর্থিক সংকটের কারণে আমরা শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানী দিতে পারি না। বর্ষা এলেই শিক্ষার্থীরা আতঙ্ক নিয়ে স্কুলে আসে।’"

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘আমি সম্প্রতি দুর্গম এলাকায় অবস্থিত কয়লা পশ্চিম সোনাই উচ্চ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। সেখানে একটি নতুন ভবনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ভবন বরাদ্দের বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্যকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’"

স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তকরণ ও একটি টেকসই নতুন ভবন নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।

আরও