স্বাধীন বাংলাদেশে এই লুটপাটের অর্থনীতি যে মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল তার নাম মুজিববাদ, যা নিয়ে জনপরিসরে এখনো বিতর্ক চলছে। এসব তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তিনি বর্ণনা করছেন, মুজিববাদ যারা সামনে এনেছিলেন তারা মনে করতেন বিদেশী সাহায্য নিয়ে এ দেশে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করবে, কিন্তু অধ্যাপক আনিস তা কখনই মনে করতেন না। তার কথায়,"‘আমি বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশের মতো এত দরিদ্র দেশও কোনো বিদেশী সাহায্য ছাড়াই উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে, যদি জাতি এর জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ শিকার করতে সংকল্প নেয়।"তাজউদ্দীন আহমদ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীও তাই মনে করতেন, সে কারণেই শেখ মুজিবের সাথে তৈরি হয় দ্বন্দ্বের। যার ফলেই তাজউদ্দীন আহমদকে আওয়ামী লীগ পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়ে, স্থলাভিষিক্ত হন জিল্লুর রহমান।’
বিশ্বের তৃতীয় মতবাদ"হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করা হয় মুজিববাদ, বিদেশী সাহায্যের পথও সুগম হয়। বিরোধিতা করেছিলেন কিনা জানি না, তবে তিনি ভীষণ বিরক্ত ছিলেন। স্বপ্নবাজ এ মানুষটি মুজিববাদের গুন্ডামি-পান্ডামি নিয়েও লিখেছেন তার ব্যক্তিগত ডাইরিতে। তিনি লিখছেন, মুজিববাদী গুণ্ডারা চারটি হোস্টেল [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে] আক্রমণ করে মুজিববাদের বিরোধী সব ছাত্রদের পেটায় ও তাদের জিনিসপত্র লুটপাট করে। ছয়জনকে অপহরণ করে। একজন ছাত্রনেতা ও শেখ কামাল এর নেতৃত্ব দেন...মতিয়া এবং অন্যান্য কয়েকজনকে ম্যানহ্যান্ডল করা হয়।"বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামাজিক-রাজনৈতিক বিকাশ, মুজিববাদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষমতার বিন্যাস ও তার দ্বন্দ্ব, নতুন দেশে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের পথে প্রতিবন্ধকতা—এসবই তিনি অকপটে বলেছেন গল্পচ্ছলে তার বইতে।
এই গুণী শিক্ষক একজন ভালো রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীও ছিলেন। তিনি শুধু অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন সংগীতেরও, ছায়ানটে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন, তা নিয়ে তিনি খুব নীরব থাকতেন। ভীষণ প্রচারবিমুখ এক মানুষ, ভালো গাইতে পারতেন। তিনি বলতেন, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গান গাওয়া আর কলসী কাঁখে নাচতে যাওয়া একই কথা, এ সংগীত দর্শনের দীক্ষা তিনি নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। বাংলাদেশ টেলিভিশন তার গান প্রচারও করেছে সে সময়। তার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত কাল রাতের বেলা গান এল মোর মনে"গানটি বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল।
উন্নয়ন অর্থনীতি, গবেষণা পদ্ধতি ও সংগীতসহ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই। আমি যখন দেখি আমার ক্লাসের বন্ধুরা বাংলাদেশী একজন লেখকের উন্নয়ন চিন্তা ও গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছে, বিতর্ক করছে। তখন বুকটা ভরে যায়, গর্ব বোধ করি, মনে হয় আমাদেরও একজন চিন্তাবিদ গবেষক আছেন। আমরা শুধু ইউরোপ কিংবা আমেরিকা থেকে ধার করি না, আমরাও বিশ্ব জ্ঞানভাণ্ডারে অবদান রাখি। আমি বিশ্বাস করি, আনিসুর রহমান বেঁচে থাকবেন তার কাজের মাধ্যমে বহুকাল ক্লাসরুমে, উন্নয়ন চিন্তার সম্মেলন কক্ষে কিংবা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গণ গবেষণায় কিংবা তার উন্নয়ন দর্শনে!
তিনি কথা বলতেন খুব ধীরে ধীরে। খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন, প্রচণ্ড প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। বাজারমুখী অর্থনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন গণমুখী দার্শনিক ও উন্নয়ন চিন্তাবিদ। আক্ষেপ হলো এ দেশে কত তুচ্ছ মানুষকে নিয়ে হই চই পড়ে প্রতিদিন; কিন্তু আনিসুর রহমান চলে গেলে কারো মনে সাড়া জাগায় না! এ আমাদের মননশীলতার এক মহাদুর্ভিক্ষ। প্ৰশ্ন জাগে, এ দেশ কী বামুনকেই অনবরত ভাববে অতিকায় হস্তী? আর আনিসুর রহমানের মতো চিন্তকেরা চাপা পড়ে থাকবে বামুনদের কোলাহলে! তবুও বিশ্বাস করি তিনি থাকবেন, যেমন দিনের আলোর গভীরে নীরবে নিভৃতে লুকিয়ে থাকে রাতের সব তারকা, আলোকিত করবেন বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে।
জাফর ইকবাল : পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া