দেশের বাজারে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই পেঁয়াজের দাম অস্থিতিশীল। ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে পেঁয়াজের দাম প্রায় তিন গুণ। সাধারণত প্রতি বছর মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত মূল মৌসুমের পেঁয়াজ বা হালি পেঁয়াজ তোলেন কৃষক। তবে এবার দাম বেশি থাকায় আগেভাগেই উত্তোলন শুরু করেন চাষীরা। এতে তারা লাভবান হলেও সার্বিকভাবে দেশের মোট উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। নির্ধারিত সময়ের আগেই অপরিণত পেঁয়াজ উত্তোলন শুরু হওয়ায় সরকারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। তবে কৃষকরা বলছেন, শুধু বাড়তি দাম নয়, বরং ভারত থেকে আমদানি শুরু হলে দর কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই পেঁয়াজ তুলতে শুরু করেছেন তারা।
পেঁয়াজের সিংহভাগ উৎপাদন হয় রবি মৌসুমে। এ মৌসুমে মুড়িকাটা ও হালি দুই জাতের পেঁয়াজ চাষ করেন কৃষক। আশ্বিন থেকে ফাল্গুন—এ সময়ে প্রথম দিকে কন্দ বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ হয়। এরপর চাষ করা হয় চারা বা হালি পেঁয়াজ। সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মাঠ থেকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ কাটা শুরু হয়। মধ্য মার্চ থেকে পুরোদমে হালি পেঁয়াজ তোলা শুরু হয়। যদিও চলতি মৌসুমে দাম বেশি থাকায় নির্ধারিত সময়ের ১৫-২০ দিন আগেই কৃষক পেঁয়াজ তুলে বিক্রি করতে শুরু করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে চারা বা হালি পেঁয়াজ ১ লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে, মুড়িকাটা বা কন্দ পেঁয়াজ ৬৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর ও বীজ পেঁয়াজ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকায়। গত বছরের এ সময়ে দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩০-৪০ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় বর্তমানে পেঁয়াজের দাম প্রায় তিন গুণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন দাম বেশি থাকলেও ভারত থেকে আমদানি হলে সামনে দাম কমে যেতে পারে। ফলে কৃষক দ্রুত তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।
পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় একটি জেলা পাবনা। এখানকার পেঁয়াজ সারা বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। জেলার সুজানগরের চাষী আবেদ আলী এ বছর ৩৬ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। এরই মধ্যে তিনি ৩৭ মণ উত্তোলন করেছেন। যদিও এ জমিতে কমপক্ষে ৪৫ মণ ফলন হওয়ার কথা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৩৭ মণ বিক্রি করে প্রায় ৯৫ হাজার টাকা পেয়েছি। কিন্তু অন্য বছর ফলন এর চেয়ে বেশি হলেও সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারতাম।’
পাবনায় এ বছর নয় উপজেলায় ৫৩ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ। কিন্তু আবাদ হয়েছে ৫২ হাজার ৬৪০ হেক্টরে। এ জমিতে প্রাথমিকভাবে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই উত্তোলন শুরু হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজবাড়ীতেও চলতি বছর বেশি লাভের আশায় অপরিণত পেঁয়াজ তুলতে শুরু করেছেন কৃষক। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় এক হাজার হেক্টর বেশি। জেলায় পেঁয়াজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার টন। যদিও কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ভালো দাম পেয়ে চাষীরা যেভাবে উত্তোলন শুরু করেছেন এভাবে চলতে থাকলে জেলায় পেঁয়াজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।
রাজবাড়ীর কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি হালি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায় আর খুচরায় ১০০-১১০ টাকা। তবে বাজারে আসা এসব পেঁয়াজ এখনো পরিপক্ব হয়নি। সাধারণত গাছ মারা যাওয়ার পর পেঁয়াজ পরিপক্ব হয়। কিন্তু সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, সবুজ রঙের গাছ থেকেই কৃষক পেঁয়াজ তুলে ফেলছেন। কৃষক সোহেল রানা বলেন, ‘সামনে ভারত থেকে আমদানি শুরু হলে দাম কমে যেতে পারে। ফলে এখন কাঁচা পেঁয়াজ তুলে বিক্রি করছেন চাষীরা।’
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অপরিপক্ব পেঁয়াজ না তুলতে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তার পরও বেশি দামের আশায় উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।’
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কৃষকরা জানান, ভারত থেকে আমদানি শুরু হলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই তারা পেঁয়াজ তুলতে শুরু করেছেন। কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে উৎপাদন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত যে পরিমাণ খরচ হয় তাতে ভারতীয় পেঁয়াজ বাজারে প্রবেশ করলে দেশী পেঁয়াজের দাম কমে যাবে। এতে আমরা লাভ করা তো দূরের কথা উল্টো লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তাই পরিপক্ব হওয়ার আগেই বিক্রি করছি।’
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন সিকদার জানান, এ বছর উপজেলায় ১১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। দাম ভালো পাওয়ায় কিছু জমির পেঁয়াজ উত্তোলন করছেন চাষীরা। আর ১০-১২ দিন পর উত্তোলন করলে ঘরে রাখতে পারবেন।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৪ টন। রোপণ করা হয়েছে ৩ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে।
কৃষক মইফুল ইসলাম জানান, চরে পেঁয়াজ চাষে বিঘাপ্রতি খরচ হয় ১৩-১৫ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে গড়ে ৪০-৫০ মণ ফলন হয়। খরচ বাদে প্রতি বিঘায় ৪০-৪৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। রমজান মাস বলে ৮০-৯০ দিনের পেঁয়াজ উত্তোলন করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। দামও বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতলুবর রহমান জানান, পেঁয়াজ সাধারণত ১১০-১২০ দিনের মধ্যে উত্তোলন করলে ফলন ভালো মানের হয়। সেই সঙ্গে দেখতে হবে গাছের পাতা হলুদ ও গোড়া নুয়ে পড়েছে কিনা। এমন হলে পেঁয়াজ জমি থেকে তুলে নিতে হবে। এছাড়া কৃষক স্বভাবতই লাভবান হওয়ার চেষ্টা করবেন। তার পরও পেঁয়াজ পরিপক্ব অবস্থায় জমি থেকে তুলে শুকিয়ে বিক্রির পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা আগাম পেঁয়াজ আবাদ করেন তারা মার্চ থেকে উত্তোলন শুরু করেন। এ বছর দাম বেশি। তাই কৃষক আগেভাগেই তুলে ফেলতে চাইবেন, সেটা স্বাভাবিক। কৃষক বিক্রি করলে সেখানে তাদের নিষেধ করার সুযোগ নেই। তবে অপরিণত পেঁয়াজ তুলে ফেললে সামগ্রিক উৎপাদনে প্রভাব পড়বে। বছরের শেষদিকে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। মূলত অনিশ্চিত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষকরা তাদের দাম নিয়ে সবসময় শঙ্কায় থাকেন। বাজারে দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে তারা অপরিণত পেঁয়াজ তুলতেন না। আমাদের বাজারে দাম হঠাৎ ওঠানামা করে। ভারত আমদানি বা রফতানি করবে এমন সিদ্ধান্তেও দাম ওঠানামা করে। এজন্য সার্বিকভাবে বাজার ব্যস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে হবে।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার প্রতিনিধি শফিউল আলম দুলাল, রাজবাড়ী প্রতিনিধি মেহেদী হাসান, ফরিদপুর প্রতিনিধি নাজিম বকাউল ও বগুড়া প্রতিনিধি এইচ আলিম)